পশ্চিম তীর

দাফনের পর সন্তানদের বাবার কবর খুঁড়ে মরদেহ তুলতে বাধ্য করল সেটলাররা

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূমিতে সব বসতি অবৈধ হলেও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার সম্প্রতি সা-নুর পুনরায় দখল ও বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন বসতি সম্প্রসারণ ও স্থাপনে অতি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের অংশ এটি

৮০ বছর বয়সী বাবা হুসেইনকে দাফন করে মাত্র বাড়িতে ফিরেছেন মোহাম্মদ আসাসা। এমন সময় কয়েকজন শিশু চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসে, ‘সেটলারটা কবর খুঁড়ছে!’

পশ্চিম তীরের ছোট্ট জনপদ আসাসায় মৃত হুসেইন আসাসা ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। গত শুক্রবার তার মৃত্যু হয়। গ্রামের নাম থেকেই পরিবারের এই প্রবীণ কর্তার নামকরণ হয়েছিল।

সাবেক এ গবাদিপশু ব্যবসায়ী ও ১০ সন্তানের জনককে গ্রামের বাড়ির উল্টো পাশে ছোট একটি পাহাড়ের ওপর অবস্থিত কবরস্থানে সাধারণ একটি কবরে দাফন করা হয়।

কোনো সমস্যা যেন না হয় তা নিশ্চিত করতে কাছের একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি থেকে বাবার জানাজা ও দাফনের অনুমতিও নিয়েছিলেন বলে জানান মোহাম্মদ।

কিন্তু আধা ঘণ্টাও পেরোয়নি, মোহাম্মদ ও তার ভাইদের আবার কবরস্থানের প্রবেশমুখে ফিরতে হয়। তারা হতবাক হয়ে দেখেন, কয়েকজনের হাতে অস্ত্রসহ একদল ইহুদি বসতি স্থাপনকারী ভারি সরঞ্জাম দিয়ে কবরটি খুঁড়ছে।

প্রথমে বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করেন মোহাম্মদ। কিন্তু তারা যখন মরদেহের ওপরের পাথরের স্ল্যাব ভেঙে ফেলতে যাচ্ছিল, তখন দৌড়ে কবরের কাছে চলে যান তিনি। মোহাম্মদ বলেন, ‘তারা মরদেহ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার অবস্থায় ছিল। আমি নিশ্চিত, তারা মরদেহ তুলে ফেলতে যাচ্ছিল। তাই আমাদের তখনই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’

বসতি স্থাপনকারীরা কাছের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত বসতি সা-নূর থেকে এসেছিল। ওই এলাকাটি কবরস্থানের ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূমিতে সব বসতি অবৈধ হলেও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার সম্প্রতি সা-নুর পুনরায় দখল ও বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন বসতি সম্প্রসারণ ও স্থাপনে অতি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের অংশ এটি।

মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় রাইফেলধারী বসতি স্থাপনকারীরা হুমকি দিচ্ছে, ‘তোমরা নিজেরাই মরদেহ তোলো, না হলে আমরা তুলব।’ তাদের দাবি ছিল, কবরস্থানটি তাদের বসতির খুব কাছাকাছি।

আরো কিছু ছবিতে দেখা যায়, এরপর মোহাম্মদ ও তার ভাইরা কাফনে মোড়ানো বাবার মরদেহ কবরস্থান থেকে তুলে পাহাড় বেয়ে নিচে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন, আর বসতি স্থাপনকারীরা তা দাঁড়িয়ে দেখছে।

পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং উত্তেজনা এড়াতে বসতি স্থাপনকারীদের কাছ থেকে খোঁড়ার সরঞ্জাম জব্দ করেছিল।

কিন্তু পরিবারটির অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীদের চাপে পড়ে তারা অপমানজনক ও অসম্মানজনকভাবে নতুন খোঁড়া কবর খালি করতে বাধ্য হচ্ছিল। ওই সময় সেনারা দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটি দেখেছে।

পরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘জনশৃঙ্খলা, আইনের শাসন এবং জীবিত ও মৃতদের মর্যাদার ক্ষতি করে এমন যেকোনো আচরণের নিন্দা জানায়’ তারা।

অফিস অব দ্য ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে একে ‘ভয়াবহ’ এবং অধিকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের ‘মানবিক মর্যাদা হরণের প্রতীক’ বলে বর্ণনা করেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, সা-নুর বসতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে। আসাসা পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের এক আত্মীয়ের জমিতেও সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা ঢুকে পড়ে। কোনো কারণ ছাড়াই সব জলপাই গাছ তুলে ফেলে।’

সা-নুর আইডিএফ সামরিক ঘাঁটির পাশে অবস্থিত। সেখানে স্থানান্তরযোগ্য ঘর এনে সেটলাররা বসতি স্থাপনের পর থেকে পুরো এলাকার বড় অংশকে ‘ক্লোজড মিলিটারি এরিয়া’ ঘোষণা করা হয়েছে।

এর অর্থ হলো, গ্রামের মানুষের জলপাই বাগান, ফসলি জমি, এমনকি কবরস্থানও এখন কার্যত তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। গ্রামবাসীরা বলেন, আইডিএফের সঙ্গে দীর্ঘ সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রবেশের অনুমতি পেলেও বসতি স্থাপনকারীরা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। তাদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে, যদিও বিশ্বের মনোযোগ এখন অন্য যুদ্ধ ও সংঘাতের দিকে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, শত শত মানুষ আহত হয়েছেন এবং আরো অনেকে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের সমর্থনে শক্তিশালী হয়ে ওঠা বসতি স্থাপনকারীরা এখন অধিকৃত অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও জীবিকার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে। তারা অস্ত্র ব্যবহার করতেও প্রস্তুত।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও