কয়েকদিন আগে ইরা, সুমন, মারুফ, তটিনীসহ আরো পাঁচ বন্ধু মিলে বেড়াতে যায় বান্দরবান। ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার পর প্রত্যেকেরই দেখা দেয় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হয় ম্যালেরিয়া। দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়ার মাধ্যমে প্রত্যেকেই সুস্থ হয়ে যায়। সীমান্তবর্তী, পাহাড় ও বনাঞ্চলবেষ্টিত পার্বত্য এলাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি থাকে। বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে এর প্রকোপ অনেক বেশি।
কারণ
পৃথিবীর প্রাচীন মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রোগ ম্যালেরিয়া। সাধারণত অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। এটি প্লাজমোডিয়াম পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট এক ধরনের সংক্রামক রোগ। প্লাজমোডিয়াম জীবাণুর পাঁচটি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপ্যারাম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত রোগীর জটিলতা বেশি। সেক্ষেত্রে প্লীহা ও যকৃত বড় হয়ে যেতে পারে। এছাড়া লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস হওয়ার কারণে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা না করলে এটি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। এখন পর্যন্ত ৬০টির বেশি প্রজাতির ম্যালেরিয়া পরজীবী আবিষ্কৃত হলেও ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী মূলত চারটি প্রজাতি। প্লাজমোডিয়াম ভাইভাক্স, ফ্যালসিপ্যারাম, ম্যালেরি ও ওভাল। এর যেকোনো একটি জীবাণু বহনকারী মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হতে পারে।
উপসর্গ
ম্যালেরিয়ার প্রধান উপসর্গ নির্দিষ্ট সময় পরপর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা। জ্বরের তাপমাত্রা ১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া এ সময় যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে—
সারাক্ষণ জ্বর অনুভূত হওয়া
অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
মাথা ও শরীরে তীব্র ব্যথা
তলপেটে ব্যথা
অনিদ্রা
ক্ষুধামান্দ্য
কোষ্ঠকাঠিন্য
বমিভাব/বমি
ক্লান্তি ও অবসাদ
খিঁচুনি
হৃৎস্পন্দনের গতি বৃদ্ধি
কাশি
প্লিহা ও যকৃৎ বড় হয়ে যাওয়া
ঝুঁকি যাদের বেশি
ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীর থেকে রক্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি।
ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় বসবাস করেন যারা।
ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় বেড়াতে যান যারা।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া মারাত্মক হতে পারে।
গর্ভবতী মায়ের ম্যালেরিয়া হলে গর্ভস্থ শিশুরও ম্যালেরিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
রোগী ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ব্লাড ফিল্মস ব্যবহার করে এ পরীক্ষা করা হয়। প্রথমবার পরীক্ষায় যদি ম্যালেরিয়া শনাক্ত না হয় তাহলে পরপর তিনদিন পরীক্ষাটি করা উচিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী চিকিৎসা শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। তবে ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে জটিল ধরন ম্যালিগন্যান্ট ও ফ্যালসিপ্যারাম ম্যালেরিয়া। এ দুই ধরনের কোনোটিতে আক্রান্ত হলে রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা যেমন রক্তশূন্যতা, কিডনি জটিলতা, শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস, খিঁচুনি প্রভৃতি দেখা দিতে পারে। তাই ম্যালেরিয়া সন্দেহ হলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করে রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
প্রতিরোধ
ম্যালেরিয়ার টিকা আবিষ্কৃত হলেও তা এখনো সহজলভ্য নয়। তাই ম্যালেরিয়ার প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে জোর দেয়া জরুরি। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রচুর তরল খাবার খাওয়া এবং প্রচুর পানি পান করা দরকার। এ সময় দেহে শক্তি ধরে রাখতে আঁশযুক্ত খাবার বেশি খেতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের মসলা যেমন আদা, দারুচিনির গুঁড়া কিংবা মেথি ভেজানো পানি খেতে পারেন।
লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিসিন বিভাগ
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল