বিশ্ব মশা দিবস আজ

আকারে ক্ষুদ্র, তবুও কেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘাতক

মশাবাহিত রোগে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। বিপরীতে সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় আনুমানিক ১ লাখ মানুষের। আর হাঙরের হামলায় বছরে মারা যান মাত্র কয়েকজন। অর্থাৎ আকারে ছোট হলেও মৃত্যুর হিসাবে মশার ধারেকাছেও নেই এসব প্রাণী।

হাঙর দেখলে ভয় লাগে। বিষধর সাপ দেখলেও আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় যে প্রাণীর কারণে, তাকে দেখে হয়তো আমরা ভয় পাওয়ার কথা ভাবিই না। প্রাণীটি এতটাই ছোট যে হাতের এক চাপে তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে। অথচ মানুষের সবচেয়ে বড় ঘাতক হয়ে উঠেছে আকারে ক্ষুদ্র এ প্রাণী—মশা, যার কারণে বছরে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটছে।

বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, মশাবাহিত রোগে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায়। বিপরীতে সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় আনুমানিক ১ লাখ মানুষের। আর হাঙরের হামলায় বছরে মারা যান মাত্র কয়েকজন। অর্থাৎ আকারে ছোট হলেও মৃত্যুর হিসাবে মশার ধারেকাছেও নেই এসব প্রাণী। তবে মশার কামড়ে মানুষ সরাসরি মারা যায় না। প্রকৃত বিপদ অন্য জায়গায়—রোগ ছড়ানোর ক্ষমতায়।

বিশ্ব মশা দিবস আজ। প্রতি বছর ২০ আগস্ট মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।

মশার কামড়ে ছড়ায় যেসব প্রাণঘাতী রোগ

মশা মানুষের শরীরে শুধু কামড়ের দাগ রেখে যায় না। অনেক সময় এর সঙ্গে শরীরে ঢুকে পড়ে ভাইরাস বা পরজীবী। এরপর শুরু হয় গুরুতর অসুস্থতা।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ম্যালেরিয়া। অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই রোগে প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষ মারা যায়। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ শিশু। স্পেনের বার্সেলোনাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএস গ্লোবালের দেয়া তথ্যানুযায়ী, বিশ্বজুড়ে আরো প্রায় ২০ কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন অসুস্থ থাকে।

মশাবাহিত রোগের তালিকা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। ডেঙ্গুতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ১০ থেকে ৪০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হন। আছে ইয়েলো ফিভার, জাপানিজ এনসেফালাইটিস এবং জিকা ভাইরাসও।

জাপানিজ এনসেফালাইটিসে বছরে ১০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের বেশির ভাগই এশিয়ার বাসিন্দা। আর জিকা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ গর্ভবতী মায়ের শরীরে এর সংক্রমণ শিশুর মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলার আশঙ্কা।

পৃথিবীতে মশার প্রজাতি কত?

পৃথিবীতে মশার ২ হাজার ৫০০টির বেশি প্রজাতি রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব অঞ্চলেই এদের দেখা যায়।

তবে এখানেই শেষ নয়। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে মশার জুড়ি মেলা ভার। মানুষ যখন মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে, মশাও বদলে নিচ্ছে তার আচরণ।

এর ভালো উদাহরণ এডিস ইজিপ্টাই। ডেঙ্গু, ইয়েলো ফিভার ও জিকা ভাইরাসের মতো রোগ ছড়ানোর ক্ষেত্রে এই মশা গুরুত্বপূর্ণ বাহক। শহুরে পরিবেশের সঙ্গেও সহজেই মানিয়ে নিতে পারে এটি। মশার এই প্রজাতি মানুষের খুব কাছাকাছি বসবাস করতে পারে। ঘরের ভেতর-বাইরে বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিকে ডিম পাড়ার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে।

আরো বড় সমস্যা তৈরি করেছে কীটনাশক প্রতিরোধী মশা। অ্যানোফিলিসের বেশ কিছু প্রজাতি দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত বিভিন্ন কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে।

শুধু তাই নয়, কিছু মশা নিজেদের খাবার সংগ্রহের সময়ও বদলে ফেলেছে। আগে যেসব মশা ঘরের ভেতরে ঢুকে মানুষকে কামড়াত, তাদের কিছু এখন বাইরে এবং দিনের অপেক্ষাকৃত আগের সময়ে সক্রিয় হচ্ছে। ফলে ঘরে মশারি ব্যবহার কিংবা কীটনাশক ছিটানোর মতো প্রচলিত প্রতিরোধব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা।

মশার অভিযোজন ক্ষমতার নতুন উদাহরণ অ্যানোফিলিস স্টেফেনসি। গ্রাম ও শহর—দুই পরিবেশেই এই মশা টিকে থাকতে পারে। ফলে ম্যালেরিয়া নির্মূলের প্রচেষ্টায় নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

কেন কিছু মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়?

অনেকেরই অভিজ্ঞতা—এক জায়গায় কয়েকজন বসে আছেন, কিন্তু মশার কামড় যেন একজনের ওপরই বেশি পড়ছে। এটি নিছক ধারণা নয়। কিছু মানুষ সত্যিই মশার কাছে অন্যদের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় হতে পারেন।

শরীরের তাপমাত্রা এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন বিষয় মশাকে মানুষের দিকে আকৃষ্ট করে।

গর্ভবতী নারীরাও মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেন। এ কারণে গর্ভাবস্থায় ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত গর্ভবতী নারী ও তার অনাগত শিশুকে সুরক্ষা দিতে গবেষকেরা নতুন প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি নিয়েও কাজ করছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি

মশার দাপট বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রার পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়া, খরা কিংবা অতিবৃষ্টির মতো ঘটনা মশার বিস্তার এবং মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।

ডেঙ্গুর বিস্তার এর একটি বড় উদাহরণ। ২০০০ সালের পর বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। রোগটি এখন এমন সব অঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে আগে এর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

মশার সঙ্গে লড়াইয়ে কৌশল বদলানো জরুরি

মশার বিরুদ্ধে লড়াই বহু পুরোনো। মশারি, কীটনাশক, প্রজননস্থল ধ্বংস—সবই ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু মশা যেভাবে নিজেদের বদলে নিচ্ছে, তাতে শুধু প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবেলা করা কঠিন।

এ কারণেই গবেষকেরা নতুন ধরনের মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি খুঁজছেন। ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি কীভাবে কীটনাশক প্রতিরোধী মশা এবং চিকিৎসার পরও রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি মোকাবেলা করা যায়, সেদিকেও নজর দেয়া হচ্ছে।

মশাবাহিত রোগ মোকাবেলায় শুধু প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাড়াতে হবে নজরদারি, নতুন প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা এবং এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ।

আরও