শিশুর ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য শুধু চিনি বাদ দেয়াই যথেষ্ট নয়; শিশুর মোট খাবার, কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ, খাবারের সময়, শারীরিক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন—সবকিছুর সমন্বয় দরকার। খাবারের পরিকল্পনা শিশুর বয়স, বৃদ্ধি, ওজন, দৈনন্দিন কার্যক্রম ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী হওয়া উচিত।
ডায়াবেটিস আছে বলে শিশুকে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা খাবার দিতে হবে এমন নয়। বরং পুরো পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি করা ভালো। খাবারে শাকসবজি, ফল, পূর্ণশস্য, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ বা দুধজাত খাবার এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খাদ্যনিয়ন্ত্রণ করা ঠিক নয়, কারণ তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রয়োজন।
কার্বোহাইড্রেটের দিকে নজর দিন
কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করার মাত্রায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। ভাত, রুটি, আলু, ভুট্টা, শস্য, ফল, দুধ ও দইসহ বিভিন্ন খাবারে কার্বোহাইড্রেট থাকে। তাই শুধু মিষ্টি বা চিনি নয়, শিশুর প্রতিটি খাবারে মোট কতটা কার্বোহাইড্রেট আছে, সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব শিশু খাবারের সময় ইনসুলিন নেয়, তাদের ক্ষেত্রে খাবারে থাকা কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ অনুযায়ী ইনসুলিনের প্রয়োজন নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে ইনসুলিনের মাত্রা নিজের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন করা উচিত নয়, চিকিৎসকের দেয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে হবে।
শিশুর খাবার কেমন হবে?
খাবারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর উপাদান রাখুন। যেমন
শাকসবজি
পরিমিত ফল
ভাত বা রুটি
ডাল
মাছ, ডিম বা মাংস
দুধ বা টক দই
বাদাম ও বীজ, বয়স উপযোগী হলে
খাবারে আঁশ, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকলে কার্বোহাইড্রেট ধীরে হজম হতে পারে এবং খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
প্লেট পদ্ধতি ব্যবহার করতে শিখাতে হবে
সুষম খাবার তৈরির সহজ একটি উপায় হলো প্লেট পদ্ধতি। প্লেটের অর্ধেক অংশে শ্বেতসারবিহীন সবজি, এক-চতুর্থাংশে প্রোটিনযুক্ত খাবার এবং বাকি এক-চতুর্থাংশে ভাত, রুটি, আলু বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার রাখা যায়। তবে শিশুর বয়স ও চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ আলাদা হতে পারে।
মিষ্টি ও পছন্দের খাবার খাওয়া যাবে কি?
ডায়াবেটিস আছে বলে শিশুকে সারা জীবন সব ধরনের মিষ্টি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে হবে—এমন নিয়ম নেই। তবে মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রিম বা অন্যান্য ডেজার্টে সাধারণত চিনি ও কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকে। তাই এগুলো মাঝে মাঝে, অল্প পরিমাণে এবং শিশুর মোট কার্বোহাইড্রেটের হিসাবের মধ্যে রেখে দেয়া যেতে পারে। মিষ্টিকে প্রতিদিনের খাবারের নিয়মিত অংশ না করাই ভালো। মিষ্টি দেয়ার পরিমাণ ও সময় শিশুর বয়স, ডায়াবেটিসের ধরন, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ এবং ইনসুলিনের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে।
খাবারের পরিকল্পনা কীভাবে করবেন?
শিশুর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট বা ক্যালরি সবার ক্ষেত্রে একই নয়। শিশুর বয়স, বৃদ্ধি, ওজন, শারীরিক কার্যক্রম, খাবারের অভ্যাস এবং ব্যবহৃত ওষুধ বা ইনসুলিন বিবেচনা করে খাবারের পরিকল্পনা করা উচিত। এ কারণে শিশুদের ডায়াবেটিসে অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শে শিশুর খাবারের ধরন ও পরিমাণ মূল্যায়ন করে ব্যক্তিগত খাবার পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন।
সুষম খাবারের পাশাপাশি ইনসুলিন, শারীরিক কার্যকলাপ এবং নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ—সবকিছু মিলিয়েই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
যে আট ধরনের খাবার সীমিত করতে হবে—
মিষ্টি ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার
মিষ্টি, চকোলেট, ক্যান্ডি, মিষ্টি বিস্কুট, কেক, ডোনাট ও অন্যান্য চিনিযুক্ত খাবার দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়াতে পারে। তাই এগুলো নিয়মিত না দিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানে অল্প পরিমাণে দেয়া যেতে পারে।
কোমল পানীয় ও চিনিযুক্ত পানীয়
কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত মিষ্টি জুস, এনার্জি ড্রিংক ও চিনি মেশানো পানীয়তে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি থাকে। এগুলো দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে। সাধারণত পানির ওপরই বেশি গুরুত্ব দেয়া ভালো।
প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
চিপস, প্যাকেটজাত বিস্কুট, কেক, ক্র্যাকার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস এবং বিভিন্ন ফাস্টফুডে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট থাকতে পারে। এসব খাবার নিয়মিত না দিয়ে ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার বেছে নেয়া ভালো।
পরিশোধিত শস্যের খাবার
সাদা পাউরুটি, ময়দার তৈরি খাবার ও অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্য দ্রুত হজম হয়ে রক্তে গ্লুকোজ বাড়াতে পারে। সম্ভব হলে লাল চাল, আটার রুটি, ওটস ও অন্যান্য বেশি আঁশযুক্ত শস্য বেছে নেয়া যেতে পারে।
অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার
ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, ভাজা চিকেন ও অন্যান্য ফাস্টফুডে চর্বি ও ক্যালোরি বেশি থাকতে পারে। এসব খাবার নিয়মিত খাওয়ার বদলে কম তেলে রান্না করা খাবার বেছে নেয়া ভালো।
অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার
চিপস, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও কিছু সসে লবণ বেশি থাকতে পারে। তাই খাবারের প্যাকেটের লেবেল দেখে সোডিয়ামের পরিমাণ খেয়াল করা উচিত।
মিষ্টি সিরিয়াল ও মিষ্টি নাশতা
কিছু প্যাকেটজাত সিরিয়াল, ফ্লেভারযুক্ত দই, মিষ্টি গ্র্যানোলা বা মিষ্টি নাশতায় চিনি বেশি থাকতে পারে। এগুলোর পরিবর্তে ওটস, ডিম, দুধ, বাদাম বা পরিমিত তাজা ফল দেয়া যেতে পারে।
ফাস্টফুড বর্জন করতে হবে
পিৎজা, বার্গার ও অন্যান্য ফাস্টফুডে কার্বোহাইড্রেট, চর্বি ও লবণ বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে পিৎজার মতো খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি বেশি চর্বি থাকায় খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে পারে। তাই এসব খাবার নিয়মিত নয়।
খাবারের লেবেল পড়ুন
প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লেবেলে মোট কার্বোহাইড্রেট, চিনি, পরিবেশনের পরিমাণ ও সোডিয়াম দেখে নেয়া ভালো। শুধু ‘সুগার ফ্রি’ বা ‘লো সুগার’ লেখা আছে কিনা, সেটি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। কারণ কোনো খাবারে চিনি কম থাকলেও মোট কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকতে পারে। তাই পুরো পুষ্টি তালিকা দেখা জরুরি।
নিয়মিত খাবারের সময় ঠিক রাখা
শিশুর খাবারের সময় ও ইনসুলিনের সময়ের মধ্যে সমন্বয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ। খাবার বাদ দেয়া বা হঠাৎ অতিরিক্ত খাওয়া রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই চিকিৎসক বা ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত খাবারের রুটিন তৈরি করা ভালো।
খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যকলাপ করা
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুরাও নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যকলাপ করতে পারে। তবে ব্যায়ামের সময় বা তার আগে-পরে রক্তে গ্লুকোজ কমে বা বেড়ে যেতে পারে। তাই শিশুর শারীরিক কার্যকলাপের ধরন অনুযায়ী কখন গ্লুকোজ পরীক্ষা করতে হবে এবং খাবার বা ইনসুলিনের পরিবর্তন দরকার কিনা, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেয়া উচিত।
লিনা আকতার: পুষ্টিবিদ। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর