বয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবা

প্রয়োজন বাড়তি যত্ন ও সমন্বিত চিকিৎসা

উন্নত দেশগুলোতে বয়স্কদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বা জেরিয়াট্রিক কেয়ার বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালিত হলেও বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও অবকাঠামো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

অথচ বয়স্কদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

বয়স্কদের সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। ফলে কিছু রোগ ও শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এসব সমস্যা মোকাবেলায় বয়স্কদের প্রয়োজন বাড়তি যত্ন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ।

দীর্ঘমেয়াদি রোগ

বয়স্কদের মধ্যে একসঙ্গে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকার প্রবণতা বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, হাড়ক্ষয় ও দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার কারণে সৃষ্ট বেডসোর—এসব সমস্যা তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তাই শুধু একটি রোগের চিকিৎসা না করে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়া জরুরি।

জেরিয়াট্রিক সিনড্রোম

বয়স বাড়ার সঙ্গে এমন কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। শরীরের সামগ্রিক সক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে এসব সমস্যা তৈরি হয় এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হতে পারে। এর মধ্যে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা ডিমেনশিয়া, চলাফেরায় ভারসাম্য হারানো এবং পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা উল্লেখযোগ্য।

বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার পেছনে দুর্বল পেশি, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, ভারসাম্যের ঘাটতি কিংবা পরিবেশগত নানা কারণও থাকতে পারে। তাই এসব ঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

প্রস্রাব ও পায়খানা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা

কিছু বয়স্ক ব্যক্তি বয়সজনিত পরিবর্তন বা বিভিন্ন রোগের কারণে প্রস্রাব ও পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়তে পারেন। ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ুর সমস্যা, স্ট্রোক, ক্যান্সার বা প্রোস্টেটের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে এ ধরনের ইনকন্টিনেন্স হতে পারে। এ অবস্থায় রোগীকে বিব্রত না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা দিতে হবে।

অপুষ্টি

বয়স বাড়লে অনেকের ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। দাঁত ও মাড়ির সমস্যা, হজমের জটিলতা বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও খাবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে বয়স্করা সহজেই অপুষ্টিতে আক্রান্ত হতে পারেন।

তাই তাদের জন্য সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা জরুরি। খাদ্যতালিকায় মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার ও বাদাম রাখা যেতে পারে। বয়স বাড়লেও পেশিশক্তি ধরে রাখতে পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।

বেডসোর

দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকা বয়স্কদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেডসোর বা চাপজনিত ক্ষত তৈরি হতে পারে। এ ধরনের সমস্যা প্রতিরোধে নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন, ত্বকের পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা দরকার।

প্রতিরোধে করণীয়

বয়স্কদের হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার কারণে পড়ে গিয়ে ফ্র্যাকচার হলে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ, নিরাপদে কিছুটা সময় রোদে থাকা এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।

হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপরোসিসের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। কোনো ওষুধ, বিশেষ করে হাড় ক্ষয়ের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, নিজ থেকে শুরু করা উচিত নয়। বয়স হয়েছে মানেই সারা দিন ঘরে বসে থাকা বা শুয়ে থাকা এমন ধারণা ঠিক নয়। শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন কিছুটা হাঁটা ও হালকা ব্যায়াম বয়স্কদের জন্য উপকারী হতে পারে।

ভারসাম্য ও পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও করা যেতে পারে। তবে কারো শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেয়া উচিত। শুধু শরীরচর্চাই নয়, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকাও মানসিকভাবে ভালো লাগার কারণ হতে পারে। সুযোগ থাকলে বয়স্কদের পার্ক, বাগান বা ছাদবাগানে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে।

বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। শুধু রোগের চিকিৎসা নয়, তাদের পুষ্টি, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক জীবনের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিবার, চিকিৎসা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই বয়স্কদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানসম্মত জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব। এখনই সময় বাংলাদেশে জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরো শক্তিশালী ও সহজলভ্য করে তোলার।

আরও