দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য ভালো রাখা ও দীর্ঘায়ুর জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার স্টেপ হাঁটার পরামর্শ শুনে আসছেন অনেকেই। সংখ্যাটি এতটাই পরিচিত যে মনে হতে পারে, যেন এটি কোনো বিজ্ঞ ডাক্তারের দেয়া চিকিৎসাপত্র, যা মানলেই দীর্ঘায়ু লাভ করা সম্ভব। কিন্তু এই সংখ্যাটির উৎপত্তি আসলে কোথা থেকে? এর পেছনে কি আসলেই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?
অবাক করার মতো বিষয় হলো, বহুল প্রচলিত এই সংখ্যার জন্ম কোনো গবেষণাগারে নয়। চিকিৎসকেরাও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে প্রথমে এটি ঠিক করেননি। ১০ হাজার স্টেপের এই গল্প আসলে তৈরি হয়েছিল একটি জাপানি যন্ত্র বিক্রির প্রচারণার অংশ হিসেবে।
১০ হাজার স্টেপের গল্প শুরু জাপানে
গল্পটি জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৬৪ সালের জাপানে। টোকিও অলিম্পিকের পর দেশটির মানুষের মধ্যে দৈনন্দিন শারীরিক ব্যায়াম ও শারীরিক সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। ঠিক সেই সময়ে বাজারে আসে ‘মানপো-কেই’ নামের একটি যন্ত্র, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘১০ হাজার স্টেপ গণনাকারী যন্ত্র’। মূলত পণ্যটি জনপ্রিয় করতে এবং মানুষের মনে সহজে জায়গা করে নিতেই ১০ হাজার সংখ্যাটিকে বেছে নেয়া হয়েছিল। এমনকি জাপানি ভাষায় ১০ হাজার লেখার বর্ণটি দেখতে অনেকটা হেঁটে যাওয়া মানুষের মতো। অর্থাৎ ১০ হাজার স্টেপ হাঁটার এই প্রচলিত ধারণাটি কোনো বিজ্ঞান গবেষণার ফল ছিল না। বরং এটি ছিল একটি ক্যাচি বিজ্ঞাপনী ট্যাগ লাইন।
৭ হাজারেই মিলছে উপকার
তবে আধুনিক বিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলছে? সম্প্রতি প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত ৫৭টি গবেষণার তথ্য-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সুস্থতার জন্য ১০ হাজার স্টেপ হাঁটার দরকার নেই। দিনে ৭ হাজার স্টেপ হাঁটলেই স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ সুফল মেলে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে ৭ হাজার স্টেপ হাঁটলেই অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এছাড়া এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ১৪ শতাংশ, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকি ৩৮ শতাংশ, বিষণ্নতার ঝুঁকি ২২ শতাংশ এবং দুর্ঘটনাবশত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ২৮ শতাংশ হ্রাস করে। আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো, প্রতিদিন ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার কদম হাঁটলেই শরীরে সুফল আসতে শুরু করে। ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার স্টেপ পর্যন্ত এই উপকারিতা ধীরে ধীরে বাড়ে এবং এরপর আর তেমন বাড়তি পরিবর্তন তৈরি হয় না।
শুধু কতটা হাঁটছেন নয়, কী গতিতে হাঁটছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ
হাঁটা হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসপ্রশ্বাস ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নিয়মিত হাঁটা ওজন নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ কমানো এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও সাহায্য করে।
তবে সব হাঁটা সমান নয়। দ্রুত হাঁটলে কম সময়েই বেশি উপকার পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে ১৫০ মিনিটের সাধারণ হাঁটার সমান উপকার মিলতে পারে মাত্র ৭৫ মিনিটের দ্রুত গতির হাঁটায়। তাই হাতে সময় কম থাকলে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়া হতে পারে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
হাঁটাহাটির সঙ্গে ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ
কেবল হাঁটাই কি সার্বিক সুস্থতার জন্য যথেষ্ট? চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, হাঁটা আমাদের শরীরের কার্ডিওভাসকুলার বা অক্সিজেন ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়ালেও পেশির শক্তি ও ঘনত্বের জন্য তা একা যথেষ্ট নয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে এবং ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ দূরে রাখতে পেশির শক্তির প্রয়োজন হয়।
তাই সার্বিক স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার জন্য প্রতিদিন অন্তত ৭ হাজার স্টেপ হাঁটার পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন হালকা ওজন তোলা বা পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম যুক্ত করা উচিত। তাহলেই সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের মূল ভিত্তি তৈরি হয়ে যাবে।
—দ্য কনভারসেশান অবলম্বনে