শ্বাসকষ্ট ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি

চল্লিশোর্ধ্ব ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্ট রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি

হৃদরোগের সঙ্গে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টের গভীর সম্পর্ক আছে। বিশেষত চল্লিশোর্ধ্ব যেসব ব্যক্তি ডায়াবেটিস কিংবা অ্যাজমা-নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় ভুগছেন তাদের হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।

হৃদরোগের সঙ্গে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টের গভীর সম্পর্ক আছে। বিশেষত চল্লিশোর্ধ্ব যেসব ব্যক্তি ডায়াবেটিস কিংবা অ্যাজমা-নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় ভুগছেন তাদের হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এক্ষেত্রে ছোট্ট দুটো পরিসংখ্যান দিলে ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব। ডায়াবেটিস রোগীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি-সম্পর্কিত একটি গবেষণা জানাচ্ছে, সাধারণ মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদরোগের ঝুঁকি দুই থেকে চার গুণ বেশি। এদিকে রেসপিরেটরি জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে দেখা যাচ্ছে, যাদের ফ্লু বা নিউমোনিয়ার সমস্যা আছে তাদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে ছয় গুণ বেশি। যাদের অ্যাজমা আছে তারা অন্তত দ্বিগুণ ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ডায়াবেটিস যেভাবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়

যারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি। ডায়াবেটিসের কারণে রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে গেলে তা রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পাশাপাশি স্নায়ুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যাকে বলা হয় নিউরোপ্যাথি। নিউরোপ্যাথির ফলে স্নায়ুতন্ত্র প্রভাবিত হয়। এতে বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। আক্রান্ত হতে পারে হৃৎপিণ্ডও। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কার্ডিয়াক অটোমেটিক ডিজফাংশন বা অটোমেটিক নিউরোপ্যাথি। এমন হলে রোগী হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। এক্ষেত্রে বুকে ব্যথার মতো দৃশ্যমান উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। এজন্য এ ধরনের হার্ট অ্যাটাককে সাইলেন্ট বা নীরব হার্ট অ্যাটাকও বলা হয়।

শ্বাসকষ্ট রোগীদের হার্ট অ্যাটাক

চল্লিশোর্ধ্ব যে ব্যক্তিরা শ্বাসকষ্টসহ শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগ, যেমন—অ্যাজমা, নিউমোনিয়া, ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) প্রভৃতিতে ভুগছেন তারা সহজেই ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হয়ে থাকেন। শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহের কারণে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হৃৎপিণ্ডে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তের সংকট দেখা দেয়। আবার ফ্লু ভাইরাস ও স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়া ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হার্টের পেশিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি হাঁপানি রোগীদের ক্যারোটিড ধমনিতে অতিরিক্ত প্লাক তৈরি হয়। এ ক্যারোটিড ধমনি হলো ঘাড়ের উভয় পাশের দুটো বড় রক্তনালি, যা ঘাড়, মস্তিষ্ক ও মুখে রক্ত সরবরাহ করে। এতে প্লাক (চর্বি, কোলেস্টেরল ও অন্যান্য পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত) তৈরি হলে হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

আগেই বলা হয়েছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের হার্ট অ্যাটাক হতে পারে হালকা উপসর্গযুক্ত কিংবা উপসর্গবিহীন। এক্ষেত্রে হালকা বুকে ব্যথা, চেয়ার বা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘোরানো, হালকা ঘাম হওয়ার মতো ব্যাপার ঘটতে পারে। তবে শ্বাসকষ্টের জটিলতায় ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে রীতিমতো দৃশ্যমান উপসর্গ দেখা যেতে পারে। যেমন—

  • তীব্র শ্বাসকষ্ট ও কাশি
  • শরীর ঘেমে যাওয়া, হাত ভিজে যাওয়া
  • কথা জড়িয়ে আসা
  • তলপেটে ব্যথা
  • বুক জ্বালাপোড়া
  • বমি ভাব বা বমি
  • ক্লান্তিবোধ
  • চোয়াল, ঘাড় বা বাঁ হাতে ব্যথা
  • তীব্র পিপাসা
  • চোখে ঝাপসা দেখা

ঝুঁকি এড়াতে করণীয়

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে রক্তচাপ, রক্তে চিনির মাত্রা, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শরীরচর্চা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে শ্বাসকষ্ট রোগীদের যদি ধূমপানের অভ্যাস থাকে তাহলে খুব শিগগির তা ছেড়ে দিতে হবে। শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে হবে। দুশ্চিন্তা পরিহার করতে হবে এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখবেন, এ দুই রোগীর হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে কিংবা কোনো ধরনের শারীরিক অস্বস্তি বোধ করলে কোনোক্রমেই সময় নষ্ট করা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে।

লেখক: হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ল্যাবএইড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা

আরও