ক্যান্সার চিকিৎসায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে মার্ক ও মডার্নার যৌথভাবে উদ্ভাবিত ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ টিকা। প্রাণঘাতী ত্বকের ক্যান্সার মেলানোমা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের পর রোগটি ফিরে আসা ও শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে পরীক্ষামূলক টিকাটি কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। এ সাফল্য ভবিষ্যতে ফুসফুস, মূত্রাশয়, কিডনি, অগ্ন্যাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের জন্যও একই ধরনের টিকা তৈরির পথ খুলে দিতে পারে বলে আশা করছেন চিকিৎসকরা।
‘ইনটিসমেরান অটোজিন’ নামের টিকাটি প্রচলিত অর্থে সুস্থ মানুষকে ক্যান্সার থেকে রক্ষার প্রতিরোধী টিকা নয়। এটি ক্যান্সার আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীর টিউমারের নিজস্ব জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে আলাদাভাবে তৈরি করা একটি চিকিৎসা। রোগীর শরীরে থাকা ক্যান্সার কোষকে নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত ও আক্রমণ করতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয় এ টিকা।
মার্ক ও মডার্না বুধবার জানায়, এক হাজারের বেশি উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগীকে নিয়ে পরিচালিত শেষ ধাপের পরীক্ষায় টিকাটি প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। পরীক্ষায় অংশ নেয়া রোগীদের টিউমার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তখন তাদের শরীরে দৃশ্যমান ক্যান্সার না থাকলেও রোগটি ফিরে আসার ঝুঁকি ছিল বেশি।
গবেষণায় পরীক্ষামূলক টিকার সঙ্গে মার্কের ইমিউনোথেরাপির ওষুধ কিট্রুডা ব্যবহার করা হয়। এতে শুধু কিট্রুডা নেয়া রোগীদের তুলনায় টিকা ও কিট্রুডা পাওয়া রোগীদের ক্যান্সার ফিরে আসতে অথবা শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লেগেছে। মডার্নার প্রত্যাশা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই কয়েক হাজার মেলানোমা রোগী এ চিকিৎসার সুবিধা পাবেন।
তবে গবেষণাটি এখনো চলছে এবং প্রতিষ্ঠান দুটি পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করেনি। চিকিৎসাটি রোগীদের সামগ্রিক আয়ু বাড়ায় কিনা, সেটিও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবেন। পূর্ণাঙ্গ তথ্য ভবিষ্যতে একটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলনে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর মেলানোমার পরিচালক ডা. রায়ান সুলিভান বলেন, এ ফলাফল সামগ্রিকভাবে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিবাচক ফলাফলটি এ ধরনের গবেষণায় আরো বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসার পদ্ধতি বদলে দিতে পারে।
আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. জুলি গ্র্যালো ফলাফলটিকে এমআরএনএ প্রযুক্তিকে ক্যান্সার চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে ‘বিশাল অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে অন্যান্য ক্যান্সারে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট গবেষণার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
প্রচলিত কেমোথেরাপি দ্রুত বিভাজিত ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার পাশাপাশি শরীরের কিছু সুস্থ কোষেরও ক্ষতি করতে পারে। আবার কিট্রুডার মতো ইমিউনোথেরাপি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর ক্যান্সার কোষের তৈরি ‘ব্রেক’ সরিয়ে দেয়। এতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করে আক্রমণ করার সুযোগ পায়। কিন্তু মডার্নার ব্যক্তিভিত্তিক টিকা রোগীর টিউমারে থাকা নির্দিষ্ট মিউটেশন বা জিনগত পরিবর্তনকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়।
এ চিকিৎসা প্রস্তুতের জন্য প্রথমে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা টিউমারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাটির ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে শুধু ক্যান্সার কোষে থাকা মিউটেশনগুলো চিহ্নিত করা হয়। এরপর একটি অ্যালগরিদম রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে উপযোগী লক্ষ্যগুলো নির্বাচন করে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট রোগীর জন্য আলাদা এমআরএনএ টিকা তৈরি করা হয়।
ইনটিসমেরান অটোজিনে সর্বোচ্চ ৩৪টি নিওঅ্যান্টিজেনের নির্দেশনা থাকতে পারে। নিওঅ্যান্টিজেন হলো ক্যান্সার কোষের জিনগত পরিবর্তনের কারণে তৈরি অস্বাভাবিক প্রোটিন। টিকা প্রয়োগের পর এমআরএনএ শরীরের কোষকে এসব নিওঅ্যান্টিজেনের প্রতিরূপ তৈরি করতে নির্দেশ দেয়। এর মাধ্যমে টি-সেলসহ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ ক্যান্সার কোষকে চিনতে এবং আক্রমণ করতে শেখে।
অন্যদিকে কিট্রুডা বা পেমব্রোলিজুম্যাব একটি পিডি-১ প্রতিরোধক ওষুধ। ক্যান্সার কোষ পিডি-১ ও পিডি-এল১ পথ ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণ এড়িয়ে যেতে পারে। কিট্রুডা সেই পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে ব্যক্তিভিত্তিক টিকা ক্যান্সারের নির্দিষ্ট লক্ষ্য চিনিয়ে দেয় এবং কিট্রুডা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সেই লক্ষ্য আক্রমণের সুযোগ করে দেয়।
চিকিৎসায় নির্দিষ্ট সময় পরপর শিরায় কিট্রুডা দেয়া হয়। পাশাপাশি রোগীর জন্য তৈরি এমআরএনএ টিকার সর্বোচ্চ নয়টি ডোজ প্রয়োগ করা হয়। শুধু কিট্রুডা ব্যবহার করলে অস্ত্রোপচারের পর ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে সাধারণত এক বছর পর্যন্ত চিকিৎসা দেয়া হতে পারে।
এর আগে ১৫৭ জন উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা রোগীকে নিয়ে পরিচালিত মধ্যবর্তী পর্যায়ের পরীক্ষার পাঁচ বছরের ফলাফল জুনে প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, শুধু কিট্রুডার তুলনায় টিকা ও কিট্রুডার সমন্বিত চিকিৎসা ক্যান্সার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ কমিয়েছে। একই সঙ্গে ক্যান্সার শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমেছে ৫৯ শতাংশ। তবে এ শতাংশগুলো আপেক্ষিক ঝুঁকি হ্রাসের হিসাব; অর্থাৎ এগুলোকে সরাসরি প্রতি ১০০ রোগীর মধ্যে কতজন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন—এভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
মার্ক ও মডার্নার তথ্য অনুযায়ী, টিকা যুক্ত করার পর নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকেত পাওয়া যায়নি। মধ্যবর্তী পর্যায়ের পরীক্ষায় টিকার সঙ্গে সম্পর্কিত সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে ছিল ক্লান্তি, ইনজেকশন দেয়ার স্থানে ব্যথা ও কাঁপুনি। মডার্নার প্রেসিডেন্ট স্টিফেন হোগ বলেন, এসব প্রতিক্রিয়া অনেকটা ফ্লু বা কভিড-১৯-এর টিকা নেয়ার পর দেখা দেয়া উপসর্গের মতো।
তবে কিট্রুডার কারণে ক্লান্তি, ডায়রিয়া, ত্বকে ফুসকুড়ি এবং অস্থিসন্ধি ও পেশিতে প্রদাহ দেখা দিতে পারে। কিছু রোগীর সুস্থ অঙ্গেও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাজনিত গুরুতর প্রদাহ তৈরি হতে পারে। ফলে রোগীর ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি ও চিকিৎসার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করেই এ ধরনের চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ম্যাস জেনারেল ব্রিগহাম ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের মেলানোমা বিশেষজ্ঞ ডা. এলিজাবেথ বুকবাইন্ডার বলেন, অস্ত্রোপচারের পর যেসব রোগীর ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা কিট্রুডার সুবিধা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তুলনা করেন। টিকা থেকে পাওয়া অতিরিক্ত সুবিধা সেই হিসাব বদলে দিতে পারে।
মেলানোমায় সাধারণত তুলনামূলক বেশি জিনগত মিউটেশন থাকে। ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য ক্যান্সার কোষ শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। এ কারণে ব্যক্তিভিত্তিক টিকার প্রথম বড় পরীক্ষার জন্য মেলানোমাকে বেছে নেয়া হয়েছিল। তবে আরো অনেক ক্যান্সারেও একাধিক মিউটেশন তৈরি হয়, যা এ প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
মার্ক ও মডার্না অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যান্সারে কয়েকটি বড় পরীক্ষা পরিচালনা করছে। মূত্রাশয় ও কিডনি ক্যান্সারে মধ্যবর্তী পর্যায়ের এবং অগ্ন্যাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সারে প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষাও চলছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এসব গবেষণার কয়েকটির ফলাফল পাওয়া যেতে পারে।
এ প্রতিযোগিতায় অন্য ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। রোশ ও বায়োএনটেক ‘অটোজিন সেভুমেরান’ নামে একই ধরনের ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ চিকিৎসা পরীক্ষা করছে। অস্ত্রোপচার করা কোলন ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার রোগীদের ওপর এর পরীক্ষা চলছে। কোলন ক্যান্সারের পরীক্ষার ফল ২০২৭ এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের ফল ২০৩১ সালে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পেন মেডিসিনের অ্যাব্রামসন ক্যান্সার সেন্টারের পরিচালক ডা. রবার্ট ভন্ডারহাইড বলেন, আগামী কয়েক বছরে একাধিক গবেষণার ফল পাওয়া যাবে। মেলানোমার ইতিবাচক ফলাফলের পর এখন সেগুলোর অনেকটিতেই সাফল্য পাওয়ার আশা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
তবে ইনটিসমেরান অটোজিন এখনো পরীক্ষামূলক চিকিৎসা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের আগে এটি সাধারণ রোগীদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। টিকাটির মূল্য, একজন রোগীর টিউমার বিশ্লেষণ থেকে টিকা প্রস্তুত করতে কত সময় লাগবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তি কীভাবে পৌঁছানো যাবে—এসব প্রশ্নেরও এখনো উত্তর পাওয়া যায়নি। সূত্র: রয়টার্স