হেপাটাইটিস সি

লিভারের নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস সি

অধ্যাপক ডা. স্বপন কুমার সরকার

রক্ত থেকে বিষাক্ত উপাদান ছাঁকা, পুষ্টির রূপান্তর এবং শক্তি সঞ্চয়ের মতো জরুরি কাজ সম্পাদন করে লিভার।

কিন্তু কোনো কারণে লিভার নিজেই আক্রান্ত হলে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে পুরো শরীরে। খুব নীরবে লিভারের কোষে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয় এমন একটি রোগের নাম হেপাটাইটিস সি ভাইরাস। ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার পর কোনো বড় ধরনের লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই লিভারকে ভেতর থেকে ক্ষয় করতে থাকে। আর যখন উপসর্গ স্পষ্ট হয়, ততক্ষণে লিভারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এ রোগটি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং সতর্ক থাকাই আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

হেপাটাইটিস সি আসলে কী?

হেপাটাইটিস সি হলো একটি সংক্রামক ব্যাধি, যা লিভারে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। ভাইরাসটি মূলত দুটি পর্যায়ে লিভারকে আক্রান্ত করে—স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত সময়কে স্বল্পমেয়াদি পর্যায় বলা হয়। অনেক সময় মানুষের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিজে থেকেই এ ভাইরাসকে বাধা দিতে পারে এবং লিভারকে সুরক্ষিত রাখে। তবে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি মানুষের ক্ষেত্রেই তেমনটি হয় না। সংক্রমণ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে লিভারে স্থায়ী হলে তাকে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস সি বলে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি। এমন ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা না করালে এটি লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সংক্রমণের উৎস এবং যেভাবে ছড়ায়

হেপাটাইটিস সি মূলত একটি রক্তবাহিত ভাইরাস। সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত কোনো সুস্থ মানুষের রক্তপ্রবাহে সরাসরি মিশে যাওয়ার মাধ্যমে এ রোগটি ছড়ায়।

 হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ অন্য কেউ ব্যবহার করলে তার শরীরে এ ভাইরাসটি প্রবেশ করে। বিশেষ করে যারা শিরায় মাদক গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে এ সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি।

 অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে শতভাগ জীবাণুমুক্ত না করে পুনরায় ব্যবহার করলে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

 রক্তে ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করে কোনো সুস্থ মানুষের শরীরে ভাইরাসবাহী রক্ত বা প্লাজমা প্রদান করা হলে এ রোগ সরাসরি সংক্রমিত হতে পারে।

 একই সুই দিয়ে একাধিক ব্যক্তির শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা এবং কান ও নাক ফোটানোর মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়ায়।

 আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত রেজার, ব্লেড, টুথব্রাশ বা নেইল কাটার সুস্থ কোনো ব্যক্তি ব্যবহার করলে, যদি সেখানে রক্তের কণা লেগে থাকে, তাহলেও সংক্রমণ হতে পারে।

 হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে।

যা দেখে সতর্ক হবেন

হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি শরীরে প্রবেশ করার পর শুরুতে কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। তবে সংক্রমণের সাত থেকে আট সপ্তাহ পর মৃদু বা প্রাথমিক লক্ষণ-উপসর্গ দেখা দিতে পারে। লক্ষণ-উপসর্গগুলো হলো—

 শরীর প্রচণ্ড অবসাদগ্রস্ত ও দুর্বল লাগে

 প্রায়ই মাঝারি ধরনের জ্বর আসে

 ক্ষুধামান্দ্য বা খাবারের প্রতি তীব্র অরুচি এবং ওজন হ্রাস পায়

 বমি বমি ভাব বা ঘন ঘন বমি হয়

 পেটের ডান পাশের উপরিভাগে অস্বস্তি বা ব্যথা

 ফ্যাকাশে রঙের মল এবং প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হয়ে যায়

 পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা হয়

তবে যখন রোগটি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয় এবং বছরের পর বছর ধরে লিভারের কোষগুলোকে ধ্বংস করতে থাকে, তখন আরো কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়:

 চোখ ও ত্বক তীব্র হলুদ হয়ে যায়

 রক্তে পিত্তরসের আধিক্যের কারণে সারা শরীরে তীব্র চুলকানি হয়

 খুব সহজেই শরীরে কালশিটে পড়ে বা সামান্য আঘাতের ক্ষত থেকে দীর্ঘ সময় রক্তপাত হয়

 পেটে অতিরিক্ত তরল জমে পেট অস্বাভাবিক ফুলে যায়

 পা ও গোড়ালি ফুলে যায়

 মনোযোগের অভাব বা তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেয়

রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

যেহেতু এ রোগের লক্ষণ সহজে প্রকাশ পায় না, তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য-পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তুললে শুরুতেই রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো হলো—

এইচসিভি অ্যান্টিবডি টেস্ট: এটি প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষা। এর মাধ্যমে শরীরে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কিনা তা দেখা হয়।

এইচসিভি আরএনএ পিসিআর টেস্ট: অ্যান্টিবডি টেস্ট পজিটিভ এলে তারপর পরীক্ষাটি করা হয়। এর মাধ্যমে রক্তের মধ্যে ভাইরাসের উপস্থিতি ও মাত্রা জানা যায়।

জিনোটাইপ টেস্ট: হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বিভিন্ন ধরন বা জিনোটাইপ থাকে। কোন ধরনের ভাইরাসে রোগী আক্রান্ত, তা জানতে এ পরীক্ষা করা হয়, যা সঠিক ওষুধ নির্বাচনে সাহায্য করে।

প্রতিরোধে করণীয়

এখন পর্যন্ত হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের কোনো কার্যকর টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। তাই সুরক্ষার একমাত্র উপায় হলো সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

 শরীরে রক্ত গ্রহণের আগে তা হেপাটাইটিস সি-মুক্ত কিনা, তা ল্যাবরেটরিতে সঠিকভাবে স্ক্রিনিং করে নিশ্চিত হোন।

 যেকোনো ইনজেকশন বা স্যালাইন নেয়ার সময় প্রতিবার নতুন এবং ওয়ান-টাইম সুই ও সিরিঞ্জ ব্যবহার নিশ্চিত করুন।

 সেলুনে দাড়ি শেভ বা চুল কাটানোর সময় নাপিত যেন অবশ্যই নতুন ব্লেড ব্যবহার করে সেদিকে নজর রাখুন।

 নিজের ব্যক্তিগত জিনিস যেমন টুথব্রাশ, রেজার, ব্লেড, নেইল কাটার কখনো অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেবেন না।

 শরীরে উল্কি বা ট্যাটু করানো কিংবা কান-নাক ফোটানোর সময় নতুন এবং সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত সুই ব্যবহার নিশ্চিত করুন।

 হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত একজন লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

লেখক: গ্যাস্ট্রো মেডিসিন, লিভার এবং পরিপাকতন্ত্র রোগ বিশেষজ্ঞ ল্যাবএইড হাসপাতাল

আরও