হাড়ের ব্যথা, ফোলা কিংবা সামান্য আঘাতে অস্বাভাবিকভাবে হাড় ভেঙে যাওয়াকে অনেকেই সাধারণ ব্যথা, খেলাধুলার চোট বা বাতের সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ হতে পারে হাড়ের ক্যান্সারের সতর্ক সংকেত। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের দীর্ঘস্থায়ী হাড়ের ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। হাড় থেকে সরাসরি উৎপন্ন ক্যান্সারকে প্রাইমারি বোন ক্যান্সার বলা হয়। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধরন অস্টিওসারকোমা। এটি বিরল হলেও শিশু ও কিশোরদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। সাধারণত হাঁটুর আশপাশের ফিমার ও টিবিয়া এবং কাঁধের কাছাকাছি হিউমেরাসের মতো দীর্ঘ হাড়ে এটি বেশি হতে পারে। অন্যদিকে শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের ক্যান্সার হাড়ে ছড়িয়ে পড়লে তাকে সেকেন্ডারি বোন মেটাস্টেসিস বলা হয়। স্তন, প্রোস্টেট, ফুসফুস, কিডনি ও থাইরয়েডসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সার হাড়ে ছড়াতে পারে।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা + ফোলা/গাঁট + অস্বাভাবিক হাড় ভাঙা = সতর্ক হোন।
বিশেষভাবে লক্ষ করুন—
হাড়ের ব্যথা দীর্ঘদিন থাকা বা ক্রমে বাড়তে থাকা
বিশ্রাম বা রাতেও ব্যথা হওয়া
আক্রান্ত স্থানে ফোলা বা শক্ত গাঁট
সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়া
আঘাতের পর ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়া
হাঁটা বা অঙ্গ নড়াচড়ায় অসুবিধা কিংবা খোঁড়ানো
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই ক্যান্সার হয়েছে, এমন নয়। অনেক সাধারণ রোগেও একই উপসর্গ হতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়?
হাড়ের টিউমার সন্দেহ হলে ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, বোন স্ক্যান বা পিইটি-সিটি করা হতে পারে। ক্যান্সার নিশ্চিত করতে বায়োপসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বোন টিউমারের ক্ষেত্রে বায়োপসি অপরিকল্পিতভাবে করা উচিত নয়। এর স্থান ও পদ্ধতি অভিজ্ঞ সার্জিক্যাল ও অনকোলজি দলের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারণ করা জরুরি। ভুলভাবে করা বায়োপসি পরবর্তী অঙ্গ সংরক্ষণকারী অস্ত্রোপচারকে জটিল করতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসায় জীবন ও অঙ্গ রক্ষার সুযোগ
অস্টিওসারকোমার চিকিৎসা সাধারণত বহুবিভাগীয় বিশেষজ্ঞ দলের সমন্বয়ে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার ধারা হলো—
কেমোথেরাপি → সার্জারি → পরবর্তী কেমোথেরাপি।
সার্জারির আগে কেমোথেরাপি টিউমারের ক্যান্সার কোষ কমাতে এবং অনেক ক্ষেত্রে অঙ্গ সংরক্ষণকারী অস্ত্রোপচারের সুযোগ তৈরি করতে সহায়তা করে। বর্তমানে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অঙ্গ কেটে ফেলার পরিবর্তে লিম্ব-স্পেয়ারিং সার্জারি করা সম্ভব। প্রয়োজনে কৃত্রিম জয়েন্ট, ধাতব ইমপ্ল্যান্ট বা পুনর্গঠনমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে ক্যান্সার সম্পূর্ণ ও নিরাপদভাবে অপসারণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
চিকিৎসার পর ফলোআপ অপরিহার্য
অস্টিওসারকোমা দূরবর্তী স্থানে ছড়ালে ফুসফুস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা, আক্রান্ত অঙ্গের মূল্যায়ন এবং বুকের এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসার পর প্রথম কয়েক বছর নিয়মিত ফলোআপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অস্টিওসারকোমা কি ভালো হয়?
হ্যাঁ, অনেক রোগীর দীর্ঘমেয়াদে ভালো থাকার সুযোগ রয়েছে। রোগ শরীরের অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়লে এবং টিউমার সম্পূর্ণ অপসারণ করা সম্ভব হলে রোগমুক্ত থাকার সম্ভাবনা থাকে। তবে ফলাফল নির্ভর করে রোগের স্টেজ, টিউমারের আকার ও অবস্থান, মেটাস্টেসিস এবং চিকিৎসার প্রতি টিউমারের প্রতিক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
অভিভাবকদের জন্য বিশেষ বার্তা
শিশু বা কিশোরের দীর্ঘদিনের হাড়ের ব্যথা, ফোলা, রাতের ব্যথা, খোঁড়ানো অথবা সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে গেলে শুধু খেলাধুলার চোট বা সাধারণ ব্যথা মনে করে অপেক্ষা করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
মনে রাখুন—হাড়ের ব্যথা মানেই ক্যান্সার নয়, কিন্তু অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাকে অবহেলাও করা যাবে না।
সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসাই হাড়ের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
লেখক : সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান
ক্লিনিকাল অনকোলজি বিভাগ
ডেল্টা হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা