বাংলাদেশে কার্ডিয়াক সার্জারির নতুন দিগন্ত

নিরাপদ অপারেশন ও স্মার্ট চিকিৎসা

প্রেক্ষাপট গত কয়েক দশকে কার্ডিয়াক সার্জারি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময়ের অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন আজ উন্নত প্রযুক্তি, সূক্ষ্ম শল্যকৌশল এবং রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক বেশি নিরাপদ ও কার্যকর হয়েছে। আধুনিক কার্ডিয়াক সার্জারি এখন প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা, টিমওয়ার্ক এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশেও কার্ডিয়াক সার্জারি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একসময় সীমিত পরিসরে পরিচালিত এ সেবা এখন একটি প্রতিষ্ঠিত ও সম্প্রসারিত চিকিৎসা শাখায় পরিণত হয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও সামরিক হাসপাতালেও ওপেন হার্ট সার্জারি শুরু হয়, ফলে সার্জিক্যাল সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

এছাড়া এমএস ও এফসিপিএসসহ বিভিন্ন উচ্চতর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে দক্ষ সার্জনের সংখ্যা বাড়ছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের কার্ডিয়াক সার্জারি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। অফ-পাম্প করোনারি বাইপাস, উন্নত মায়োকার্ডিয়াল প্রটেকশন এবং কার্ডিওপালমোনারি বাইপাস প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অপারেশনের নিরাপত্তা ও ফলাফল উন্নত হয়েছে। ভালভ, অ্যাওর্টা ও জন্মগত হৃদরোগের অপারেশনও নির্বাচিত কেন্দ্রে সফলভাবে করা হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে—বিশেষ করে রোগীর অতিরিক্ত চাপ, দেরিতে রোগ নির্ণয় এবং দক্ষ জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা।

আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা

করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফটিং (সিএবিজি): বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে প্রচলিত হার্ট সার্জারিগুলোর একটি সিএবিজি এখন আরো নির্ভুল ও রোগীকেন্দ্রিক হয়েছে। বর্তমানে ‘হার্ট টিম’ পদ্ধতিতে কার্ডিওলজিস্ট ও সার্জন একসঙ্গে রোগী মূল্যায়ন করেন। সিনটেক্স স্কোর ও এফএফআরের মতো বৈজ্ঞানিক টুল ব্যবহার করে সর্বোত্তম চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।

এখন আর্টেরিয়াল গ্রাফট (যেমন ইন্টারনাল থোরাসিক ও রেডিয়াল আর্টারি) বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ এগুলোর স্থায়িত্ব বেশি। মিনিমালি ইনভেসিভ সিএবিজি এবং এন্ডোস্কোপিক ভেইন হার্ভেস্টিং প্রযুক্তি ব্যবহারে অপারেশনের আঘাত, ব্যথা ও জটিলতা কমে।

হার্ট ভালভ সার্জারি : ভালভ রোগ নির্ণয়ে এখন উচ্চ মানের ইকোকার্ডিওগ্রাফি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিকিৎসায় ভিডিওসহ ইকো রিপোর্ট প্রদান করা জরুরি, কারণ এতে ভালভের গতিশীল কার্যক্রম সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়।

যেখানে সম্ভব, ভালভ রিপেয়ারকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, কারণ এতে হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা ভালো থাকে এবং জটিলতা কম হয়। প্রয়োজনে ভালভ রিপ্লেসমেন্ট করা হয় এবং রোগীর বয়স, জীবনযাত্রা ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করে ভালভ নির্বাচন করা হয়।

মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতিতে ছোট কাটা দিয়ে ভালভ সার্জারি এখন সম্ভব, যা রোগীর দ্রুত আরোগ্য নিশ্চিত করে।

অ্যারিদমিয়া সার্জারি: অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের মতো হৃৎস্পন্দনের সমস্যার সার্জারি বিশ্বে এখন প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশে এখনো প্রায় অনুপস্থিত। মেইজ পদ্ধতি ও আধুনিক অ্যাবলেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকর। এ খাতে উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।

হার্ট ফেইলিউর সার্জারি : উন্নত বিশ্বে হার্ট ফেইলিউরের জন্য ভেন্ট্রিকুলার অ্যাসিস্ট ডিভাইসসহ (ভিএডি) আধুনিক চিকিৎসা প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশে এটি এখনো সীমিত। অবকাঠামো, ব্যয় ও প্রশিক্ষণের অভাবে এ সেবা বিস্তৃত হয়নি।

অ্যাওর্টিক সার্জারি : জটিল অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম ও ডিসেকশনের চিকিৎসায় আধুনিক সার্জারি জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা রাখে। উন্নত দেশে বিশেষায়িত টিম এ সার্জারি সফলভাবে করে থাকলেও বাংলাদেশে এ খাতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

উপসংহার

কার্ডিয়াক সার্জারি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে—বড় কাটা ও জটিল অপারেশন থেকে এখন এটি হয়ে উঠছে আরো সূক্ষ্ম, নিরাপদ ও রোগীকেন্দ্রিক। আধুনিক চিকিৎসায় মিনিমালি ইনভেসিভ কার্ডিয়াক সার্জারি (এমআইসিএস) একটি বড় অগ্রগতি, যা কম কাটা, কম ব্যথা, দ্রুত আরোগ্য এবং উন্নত ফলাফল নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশে এখনো কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও টিমওয়ার্কের মাধ্যমে এ ব্যবধান দূর করা সম্ভব। এতে রোগীরা দেশের মধ্যেই বিশ্বমানের চিকিৎসা পাবে এবং বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমে যাবে।

লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কো-অর্ডিনেটর, কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ, ইউনিকো হসপিটালস পিএলসি, ঢাকা

ছবি: লেখক

আরও