শিশুদের মাম্পস নিয়ে ভয়?

জানুন কারণ ও প্রতিরোধ

মাম্পসের টিকা নিয়ে না থাকলে অথবা শৈশবের টিকা থেকে প্রাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে গেলে প্রাপ্তবয়স্করা মাম্পস ভাইরাসের সংস্পর্শে এ রোগে সহজে আক্রান্ত হতে পারেন।

মাম্পস ছোঁয়াচে রোগ। প্যারামিক্সোভাইরাস শ্রেণীর অন্তর্গত আরএনএ ভাইরাসের সংক্রমণের মাধ্যমে ছড়ায় এ রোগ। সাধারণত ৫-১৫ বছর বয়সী শিশুরা এর সহজ আক্রমণের শিকার হয়। এটি শিশুদের রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও বয়স্করাও এর ঝুঁকিমুক্ত নন। কারো কারো ক্ষেত্রে মাম্পস সৃষ্টি করতে পারে গুরুতর জটিলতা। এ রোগ ছোঁয়াচে হওয়ায় নিজেকে এবং পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষার জন্য সচেতনতা জরুরি। মাম্পস থেকে সুরক্ষিত থাকতে জানতে হবে এর সংক্রমণের ধরন ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে।

যেভাবে ছড়ায়

মানবদেহে লালা নিঃসরণকারী তিন ধরনের গ্রন্থি রয়েছে। প্যারোটিড গ্রন্থি হলো লালাগ্রন্থিগুলোর একটি, যা কানের নিচে ও চোয়ালের পেছনে অবস্থিত। এ গ্রন্থিতে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। ভাইরাসজনিত সংক্রমণকে মাম্পস বলা হয়, যা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। মাম্পস রোগের কোনো বাহক নেই। মাম্পস ভাইরাস সাধারণত শ্বাসনালির মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির লালা, হাঁচি-কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেমন গ্লাস, চামচ, থালা ব্যবহার করলে এ রোগ দ্রুত ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির চুম্বনের মাধ্যমে লালায় থাকা ভাইরাস অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সাধারণত লক্ষণ প্রকাশ বা লালাগ্রন্থি ফোলার পাঁচদিন আগে থেকে পাঁচদিন পর পর্যন্ত এ রোগ বেশি সংক্রামক থাকে। এ সময় বাচ্চাদের স্কুলে যেতে না দেয়াই নিরাপদ।

প্রাপ্তবয়স্কদের মাম্পসের কারণ

মাম্পসের টিকা নিয়ে না থাকলে অথবা শৈশবের টিকা থেকে প্রাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে গেলে প্রাপ্তবয়স্করা মাম্পস ভাইরাসের সংস্পর্শে এ রোগে সহজে আক্রান্ত হতে পারেন।

সংক্রমিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে বা বাড়িতে প্রাপ্তবয়স্কদের মাম্পসে আক্রান্ত হওয়ার একটি সাধারণ কারণ।

লক্ষণ

এ রোগের প্রধান লক্ষণ হলো গালের দুই পাশে প্যারোটিড গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার পাশাপাশি তীব্র ব্যথা। এর সঙ্গে আরো কিছু লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন মৃদু বা তীব্র জ্বরের সঙ্গে শরীর ব্যথা হয়, খাবারে অরুচি দেখা দেয়, মাথাব্যথা ও ক্লান্তি ভাব। সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার পাঁচ-সাতদিনের ভেতর এটি কমে যায় এবং ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হয়।

চিকিৎসা ও ঘরোয়া যত্ন

বিশ্রাম ও বিচ্ছিন্নতা: রোগ ছড়ানো বন্ধ করতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্তত পাঁচদিন পুরোপুরি আলাদা রাখতে হবে। বাচ্চাদের সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত থাকুন। মাস্ক পরিধান করুন।

ব্যথানাশক: জ্বর ও ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন ওষুধ খাওয়াতে পারেন।

সহজপাচ্য খাবার: সহজে চিবানো যায় এমন নরম খাবার এবং প্রচুর পানি ও তরল খাবার দিন। টক বা অ্যাসিডিক খাবার যেমন লেবু, কমলা এ জাতীয় ফল এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো লালাগ্রন্থিতে উদ্দীপনা বাড়িয়ে ব্যথা বাড়ার কারণ হতে পারে।

গরম সেঁক দিন, গালের ফোলা অংশে গরম বা ঠাণ্ডা কাপড়ের সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায়।

প্রতিরোধে করণীয়

মাম্পস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শিশুদের যথাসময়ে এমএমআর ভ্যাকসিন দেয়া।

সঠিক সময়ে শিশুকে টিকা দেয়া: এমএমআর টিকার দুটি ডোজ মাম্পসের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। প্রথম ডোজটি সাধারণত ১২-১৫ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় বুস্টার ডোজটি চার-ছয় বছর বয়সের আগে দেয়া হয়। মাম্পস ছাড়া আরো দুটি জীবাণু হাম ও রুবেলার বিরুদ্ধেও এটি একটি সুরক্ষা ভ্যাকসিন। যেসব প্রাপ্তবয়স্ক শৈশবে এ টিকা নিতে পারেননি তাদের টিকা নিতে হবে। বিশেষ করে যারা জনবহুল কর্মক্ষেত্র বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কাজ করেন।

স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ: কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে এবং খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। বিশেষ করে কাশি, হাঁচি বা আক্রান্ত কারো ব্যবহৃত কোনো জিনিস স্পর্শ না করা।

ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলা: যাদের মধ্যে মাম্পসের লক্ষণ যেমন গাল বা চোয়াল ফোলা দেখা যাচ্ছে, এমন ব্যক্তিদের থেকে নিজে ও শিশুদের দূরত্ব বজায় রাখুন। আক্রান্তদের সঙ্গে থালাবাসন, খাবার বা পানীয় ভাগাভাগি না করতে শিশুকে সচেতন করুন।

শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শিষ্টাচার নিয়ম মানা: ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে কাশি বা হাঁচির সময় সর্বদা টিস্যু বা কনুই দিয়ে শিশুর মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে শেখান।

সংক্রমিত ব্যক্তির কোয়ারেন্টাইন: মাম্পসে আক্রান্ত হলে বা উপসর্গ শুরু হওয়ার পর কমপক্ষে পাঁচদিন বাড়িতে থাকুন এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। অন্যদের সুরক্ষার জন্য আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে রাখুন।

সঠিক যত্ন না নিলে মাম্পস কিছু গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। যেমন প্যানক্রিয়াটাইটিস, মেনিনজাইটিস, শ্রবণশক্তি হ্রাস ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষের প্রদাহ (অর্কাইটিস), যা পরবর্তী সময়ে বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। নিজে সচেতন হোন এবং পরিবারের সবাইকে মাম্পস সম্পর্কে সচেতন করুন। শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, সবাইকে নিয়ে সুস্থ থাকুন।

লেখক: উপপরিচালক, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট

চেম্বার: ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান, ঢাকা

আরও