শারীরিক পরিবর্তনের একটা সময়ে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়, যাকে আমরা বলি মেনোপজ বা ঋতুবন্ধ। একটি মেয়ের জীবনে এ ঘটনাপ্রবাহ একেবারেই সাধারণ। কেউ না চাইলেও মেনোপজ হবেই। তাকে হয়তো কিছুদিন বিলম্বিত করা যাবে, কিন্তু এড়ানো যাবে না। মেয়েদের শরীরে মেয়েলি হরমোনের তারতম্যে এ শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। কিশোরী বয়সে যেমন হরমোনের প্রভাবে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয়, তেমনি জীবনের শেষের দিকে এ হরমোনের অভাবে মেনোপজ হয়। সাধারণত ৪০ বছরের পর যদি পুরো এক বছর ঋতু বন্ধ থাকে, তাহলে তাকে আমরা মেনোপজ বলি। মেনোপজকে আমরা সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি— স্বাভাবিক ও কৃত্রিম
স্বাভাবিক মেনোপজ
মেয়েরা যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখনই তাদের ডিম্বাশয়ে প্রায় ৭০ লাখ ডিম থাকে। জন্মের সময় তা কমে গিয়ে ১০-১২ লাখে পৌঁছায়। আর কিশোরী বয়সে তা তিন-পাঁচ লাখ হয়। প্রকৃতপক্ষে তৈরি হওয়ার পর থেকেই ডিমগুলো সংখ্যায় কমতে থাকে। পূর্ণ বয়স হলে যখন মাসিক শুরু হয়, তখন প্রত্যেক মাসে ডিম্বস্ফোটন হয়। মাত্র ৪০০-৫০০ ডিম সারা জীবনে ফুটে থাকে। এ ডিম থেকেই মেয়েদের হরমোন তৈরি হয়, তাই যতই মেনোপজের দিকে এগোনো যায়, ততই হরমোন কমতে কমতে একপর্যায়ে শূন্য হয়ে যায়। অথবা যেগুলো থাকে, সেগুলো কাজ করে না।
কৃত্রিম মেনোপজ
যদি অপারেশন করে দুটি ডিম্বাশয় ফেলে দেয়া হয়, অথবা তেজস্ক্রিয় রশ্মি, কেমোথেরাপি কিংবা কোনো কারণে ডিম্বাশয়ের রক্ত সঞ্চালন কমে যায়, তাহলেও মেনোপজ হতে পারে।
মেনোপজ হওয়ার ফলে শরীরে বিভিন্ন হরমোনের ঘাটতি অথবা আধিক্য ঘটে। পুরুষ হরমোন অ্যান্ড্রোজেন প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়, কিন্তু ইস্ট্রোজেন বেশি কমে যাওয়ায় অ্যান্ড্রোজেনের কিছুটা আধিক্য হয়, তার ফলে মেনোপজের পরে অনেক নারীর কিছু দাড়ি-গোঁফের আধিক্য দেখা যায়। মেয়েদের হরমোন ইস্ট্রোজেন অনেক কমে যাওয়ায় বার্ধক্যের ছাপ দেখা যায়। চামড়া কুঁচকে যায়, লাবণ্য নষ্ট হয়ে যায়, হাড় নরম হয়ে যায় এবং হৃদরোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। অনেকে এজন্য কৃত্রিম ইস্ট্রোজেন নিয়ে থাকে। ফলে তাদের এসব উপসর্গ কিছুটা কম হয়।
শারীরিক পরিবর্তন
প্রজননতন্ত্রে ইস্ট্রোজেনের অভাবে যোনিপথ শুকিয়ে যায় বা শুষ্ক হয় এবং প্রদাহ ও ইনফেকশন হয়। মেনোপজের সময় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় নানা ধরনের অসুখ হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মিলনের সময় ব্যথা অনুভব হয়। জরায়ু ও জরায়ুমুখও শীর্ণ হয়ে যায়। এতে অবশ্য একটাই সুবিধা হয়, যদি কারো জরায়ুতে আগে থেকে টিউমার থাকে, তবে তা কমে যায়।
ব্যথাযুক্ত সহবাস
বিশেষত যোনিপথের শীর্ণতার কারণে সহবাসে ব্যথা হয়ে থাকে। এতে হরমোন খাওয়া বা ক্রিম ও কিছু লুব্রিক্যান্ট ব্যবহারে ব্যথা প্রশমন করা যায়।
হাড় ক্ষয়ে যাওয়া
মেনোপজে এটা একটা মারাত্মক রকমের জটিলতা। শরীরের হাড় শক্ত থাকার জন্য ক্যালসিয়ামে সঙ্গে হরমোন (ইস্ট্রোজেন) অপরিহার্য। তাই হরমোনের অভাবে শরীরের হাড় দুর্বল হয়ে ক্ষয় হয়ে যায়। ফলে সহজেই হাড় ভেঙে যায়। ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড় ভাঙা ছাড়াও পিঠে বা কোমরে ব্যথা হতে পারে। অনেকের ভুল ধারণা থাকে হরমোন খেলে ক্যান্সার হয়। এটা ঠিক নয়। প্রথম পাঁচ বছর কোনো খারাপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই হরমোন খাওয়া যেতে পারে। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।
খাওয়াদাওয়া
মেনোপজের সময় ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার খাওয়া জরুরি। এ সময়ে খাদ্যাভ্যাসের কিছুটা পরিবর্তন দরকার। সহজপাচ্য খাবার খাওয়া ভালো, নিয়মিত হাঁটাচলা, খাদ্যগ্রহণ, বিশ্রাম শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। যাদের ডায়াবেটিস আছে মেনোপজে তাদের জটিলতা বেশি দেখা যায়। তাই সামান্য অসুবিধা হলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। মেনোপজ জীবনের একটা পরিবর্তন। একে হাসিমুখে মেনে নেয়া ও করণীয় কাজগুলো ঠিকমতো করলে জীবনটা সুন্দর ও অর্থবহ হতে পারে।
সুস্থ থাকুন
মেনোপজ হলেই যে জীবন শেষ হয়ে যায়, নারীত্ব শেষ হয়ে যায় তা নয়। রোগীকে বোঝাতে হবে একজন নারীর জীবনের এক-তৃতীয়াংশ বা বেশি সময় মেনোপজে কাটাতে হয়। তাই এ সময়টাকে অর্থবহ করে তুলতে হবে। নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। স্বাভাবিক হাঁটাচলা ও কাজকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। নিয়ম করে দুবেলা হাঁটতে হবে। এ সময়ে হরমোনের অভাবে নারীদের কিছুটা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হয়ে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। কাজেই পরিবারের অন্যান্য সদস্য বিশেষ করে স্বামীর ভূমিকা এখানে উল্লেখযোগ্য। স্বামীকে সহানুভূতিশীল, সহমর্মী হতে হবে, স্ত্রীকে সময় দিতে হবে, সেই সঙ্গে গুরুত্বও দিতে হবে।
লেখক: চিফ কনসালট্যান্ট, অবস অ্যান্ড গাইনি
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল