স্থূলতার কারণ
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: উচ্চ ক্যালরিযুক্ত, প্রক্রিয়াজাত ফাস্ট ফুড এবং মিষ্টি বা চিনিযুক্ত পানীয় অত্যধিক পরিমাণে গ্রহণ করা স্থূলতার অন্যতম প্রধান কারণ।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: কায়িক শ্রমের অভাব, যেমন দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, কম্পিউটার বা টেলিভিশন দেখার প্রবণতা এবং ব্যায়াম না করা।
বংশগত বা জেনেটিক প্রভাব: পরিবারের কারো স্থূলতা থাকলে জিনগত কারণেও স্থূলতা হতে পারে।
হরমোনের তারতম্য: পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওএস), কুশিং সিনড্রোম বা থাইরয়েডের সমস্যার মতো স্বাস্থ্যজনিত কারণ।
মানসিক চাপ ও ঘুম: পর্যাপ্ত বা ভালো মানের ঘুমের অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে ওজন বাড়ায়।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: স্টেরয়েড, কিছু জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা বিষণ্নতাবিরোধী ওষুধের কারণে ওজন বাড়তে পারে।
পরিবেশগত কারণ: অস্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা এবং কায়িক শ্রমের অভাবজনিত কর্মপরিবেশ।
স্থূলতার কারণে যেসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে সেগুলো হলো—
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস
শরীরে রক্তের গ্লুকোজ কোষে পৌঁছে দিতে ইনসুলিনের প্রয়োজন হয়। ইনসুলিন পেশি ও চর্বি কোষে গ্লুকোজ পরিবহন করে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখে।
কিন্তু যখন শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দেয়, তখন তাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (আইআর) বলা হয়। এ অবস্থায় অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। কিছুদিন পর্যন্ত এটি সম্ভব হলেও একসময় অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায় এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সৃষ্টি হয়। তাই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সকে প্রাক-ডায়াবেটিস অবস্থা হিসেবে ধরা হয়।
স্থূলতা বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি (কেন্দ্রীয় স্থূলতা), টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়ায়।
উচ্চ রক্তচাপ
স্থূল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ একটি সাধারণ সমস্যা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে রক্তচাপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ওজন বাড়লে রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
উচ্চ কোলেস্টেরল
শরীরের অতিরিক্ত চর্বি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
হৃদরোগ ও স্ট্রোক
স্থূলতা হৃদরোগের একটি প্রধান কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীর বিএমআই ২৯-এর বেশি, তাদের করোনারি ধমনি রোগের ঝুঁকি তিন-চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
যাদের এরই মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে স্থূলতা দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কাও বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া স্থূলতা স্ট্রোকের ঝুঁকিও বৃদ্ধি করে।
ক্যান্সার
স্থূলতা বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। যেমন—
পুরুষ ও নারীদের কোলন ক্যান্সার
পুরুষদের প্রোস্টেট ও মলদ্বার ক্যান্সার
পিত্তথলি ও জরায়ুর ক্যান্সার
এছাড়া বিশেষ করে মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কারণ শরীরের চর্বি টিস্যু ইস্ট্রোজেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে এবং দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রার ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
গলস্টোন
অতিরিক্ত ওজন পিত্তথলিতে পাথর (গলস্টোন) তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।
গাউট ও গাউটি আর্থ্রাইটিস
স্থূলতা রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ায়, যা গাউট এবং গাউটি আর্থ্রাইটিসের কারণ হতে পারে।
অস্টিওআর্থ্রাইটিস
অতিরিক্ত শরীরের ওজন হাঁটু, নিতম্ব ও কোমরের নিচের অংশের জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
নিদ্রাহীনতা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া
স্থূলতা ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে স্লিপ অ্যাপনিয়া নামক অবস্থায় ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস বারবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগসহ নানা জটিলতার কারণ হতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, স্থূলতা একটি বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গ্রহণের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।