পার্কে হাঁটতে গিয়ে গাছের বাকল ছোঁয়া, ঘাসে বসা কিংবা খালি হাতে মাটি ধরার অভ্যাসকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার উপায় হিসেবেই দেখি। কিন্তু গবেষণা বলছে, মাটি, গাছপালা ও শ্যাওলার মতো প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শ ত্বকের অণুজীবের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাতেও। আর অবশ্যই তা ইতিবাচক অর্থে।
ফিনল্যান্ডের পরিবেশ ইনস্টিটিউটের এক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা ২০ সেকেন্ড মাটি কিংবা সবুজ ঘাষে হাত ঘষে পরিষ্কার পানিতে হাত ধুয়ে ফেললেও তাদের ত্বকে অণুজীবের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বেড়ে যেতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বাইরে থেকে হাত পরিষ্কার দেখালেও ভেতরে ত্বকের ভেতরের জীবাণুসমাজে ঘটে যায় বড় ধরণের পরিবর্তন।
আমাদের ত্বকের সব জীবাণুই যে ক্ষতিকর, এমন নয়। বরং নানা ধরনের জীবাণু একসঙ্গে থাকলে তারা একে অপরকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। আর এক্ষেত্রে ভালো অণুজীব ক্ষতিকর জীবাণুর আধিপত্য ঠেকাতে পারে। যদিও এ পরিবর্তন স্থায়ী নয়। কিছু সময় পর অণুজীবগুলোর পরিস্থিতি আবার আগের কাছাকাছিই ফিরে যায়। তাই আমাদের নিয়মিত প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা বেশি কার্যকর হতে পারে।
শিশুদের মাটি-জল-কাদা
ফিনল্যান্ডের ৪৩টি শিশুদের কেয়ারসেন্টারে এ নিয়ে তিন বছরের গবেষণা চলছে। একটি কেন্দ্রে শিশুরা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কাঠ, গাছ, ঝোপ, বালি, পানি, মাটি ও কাঠের টুকরো নিয়ে খেলে। গবেষকেরা তাদের ত্বক, লালা ও মলের জীবাণু এবং রক্ত ও চুলের নমুনা পরীক্ষা করছেন।
এর আগে ২০১৬-১৭ সালে একটি শিশু কেয়ারসেন্টারের পাকা উঠানে বনভূমির মাটি ও নানা রকমের গাছ লাগানোর বক্স বসানো হয়। সেখানে এক বছর নিয়মিত খেলার পর শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, পাকা উঠানে খেলাধুলা করা শিশুদের তুলনায় বনভূমির মাটিতে খেলাধুলা শিশুদের শরীরে জীবাণুবৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি বেশি ছিল। এমনকি তাদের শরীরে সম্ভাব্য রোগজীবাণুর সংখ্যাও কম ছিল।
ত্বক থেকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা
শিশুদের এ রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রভাব শুধু তাদের ত্বকেই সীমাবদ্ধ নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জীবাণুবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ মাটির বালিতে খেলা শিশুদের ত্বকে নির্দিষ্ট কিছু জীবাণু বেড়ে যায়। একই সঙ্গে তাদের রক্তে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারী সাইটোকাইনের পরিবর্তন দেখা যায়। বনভূমির মাটির সংস্পর্শে গামাপ্রোটিওব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বাড়ার সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী টি-কোষ বৃদ্ধির সম্পর্কও পাওয়া যায়।
মাটি ও উদ্ভিদের সংস্পর্শ কেবল আমাদের ত্বকের জন্যই উপকারী নয়, এটি শরীরের সার্বিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়
তবে এর অর্থ প্রকৃতির সংস্পর্শে এলেই যে কোনো রোগ হবে না এমন নয়, তবে সম্ভাব্য বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায় বলে গবেষকদের দাবি। এসব রোগের ঝুঁকি কমাতে জীবাণুবৈচিত্র্য ভূমিকা রাখতে পারে, তবে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
ঘরের বাগানেও মিলছে উপকার
ঘরে যারা অণুজীবসমৃদ্ধ মাটিতে শাকসবজি চাষ করেছেন, এক মাসের মধ্যে তাদের ত্বকের অণুজীব বৈচিত্র্য ও রক্তের প্রদাহরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি অফিসে জীবন্ত উদ্ভিদের দেয়াল বা ‘গ্রিন ওয়াল’ স্থাপনের পর মাত্র দুই সপ্তাহে কর্মচারীদের ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত হয়েছে এবং রক্তে প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদানের মাত্রা কমেছে। মোটা কথা তাদের শরীরে যে কোনো ধরণের ইনফেকশন তৈরির সম্ভাবনা কমে গেছে।
তাই গবেষকদের মতে, শহর এমনভাবে তৈরি হওয়া উচিত, যাতে মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরাতেই গাছ, ঘাস ও মাটির সংস্পর্শ ঘটে। প্রকৃতির কাছে যেতে আলাদা করে সময় বের করার প্রয়োজন না হলেও চলে। তবে জীবাণুবৈচিত্র্য কীভাবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, তা বুঝতে আরো গবেষণা দরকার। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অন্তত বলছে, সামান্য মাটি-কাদায় হাত মাখার সম্ভাব্য উপকারকে একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
—মাহফুজা মিম অনূদিত ও পরিমার্জিত