শিশুদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বড়রা অনেক সময় নিজেরাই খাবার, ওষুধ ও জীবনযাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে অভিভাবকদেরই নিয়মিত নজর রাখতে হয়। তাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর প্রথম ধাপ হওয়া উচিত পরিবার থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করা।
পরিবারে কারো ডায়াবেটিস থাকলে শিশুর ভবিষ্যতে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা থাকলে ঝুঁকি আরো বাড়ে। তাই শিশুর অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্ষুধা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা বা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। দ্রুত শনাক্ত করা গেলে জটিলতা এড়ানো এবং যথাযথভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
শিশুর ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে। শিশুর বয়স, ওজন, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও ডায়াবেটিসের ধরন বিবেচনা করে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শে খাদ্যতালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, শিশুকে সক্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত করাও জরুরি। দীর্ঘ সময় মুঠোফোন, ট্যাব, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার পরিবর্তে বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী খেলাধুলা, হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে হবে। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিশুর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও বজায় থাকে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইনসুলিন নেয়ার পর খাবার গ্রহণের বিষয়টি চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে। রক্তে শর্করা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে দুর্বলতা, ঘাম, কাঁপুনি, মাথা ঘোরা, আচরণে পরিবর্তন বা অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শিশুর সঙ্গে বয়স উপযোগী জরুরি শর্করাযুক্ত খাবার বা গ্লুকোজ রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ ও তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে অভিভাবকদের ভালোভাবে জানতে হবে।
শিশু স্কুলে গেলে বিষয়টি শিক্ষকদেরও জানানো প্রয়োজন। শিশুর ডায়াবেটিসের ধরন, ইনসুলিনের প্রয়োজন, রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার লক্ষণ এবং জরুরি অবস্থায় কী করতে হবে—এসব বিষয়ে অন্তত সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে অবহিত করা উচিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকেও নিজের রোগ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে, যাতে ধীরে ধীরে সে রক্তে শর্করা পরীক্ষা, খাবার ও ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বুঝতে শেখে।
শিশুর ডায়াবেটিস প্রতিরোধে পরিবারের অভ্যাসের বড় প্রভাব রয়েছে। বাবা-মা নিজেরা স্বাস্থ্যকর খাবার ও সক্রিয় জীবনযাপন করলে শিশুর মধ্যেও সে অভ্যাস তৈরি করা সহজ হয়। ছোটবেলা থেকেই শাকসবজি, ফলমূল, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শিশুকে পুরস্কার হিসেবে নিয়মিত মিষ্টি, চকোলেট বা কোমল পানীয় দেয়ার সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।
শিশুর ওজনের দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শিশুর ওজন ও উচ্চতা বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে কিনা, তা চিকিৎসকের পরামর্শে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। প্রতিদিনের রুটিনে খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিশুর মানসিক সুস্থতা ও আত্মবিশ্বাসের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার যদি সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করে, তাহলে ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ও দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেকটাই বজায় রাখা সম্ভব।