বর্ষা মৌসুম বিদায়ের পথে। রাত-দিনের তাপমাত্রায়ও আসছে বেশ পরিবর্তন। এই গরম, তো পরক্ষণই আবার ঠাণ্ডা। আবহাওয়ার এ হঠাৎ রূপ বদল প্রভাব ফেলে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষ করে যাদের সাইনাসের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য মৌসুম পরিবর্তনের সময়টা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এ সময় তারা সহজেই সাইনোসাইটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
সাইনোসাইটিস কী
আমাদের নাক ও চোখের চারপাশে কিছু ফাঁপা স্থান রয়েছে, এরা সাইনাস নামে পরিচিত। নাকের দুই পাশে প্রায় আটটি সাইনাস থাকে যা আমাদের শরীরে বাতাস চলাচলে সাহায্য করে। সাধারণ সর্দি-জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা, অ্যালার্জি, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস বা ভাইরাসের কারণে সাইনাসের ঝিল্লিতে প্রদাহ হতে পারে। সাইনাসে প্রদাহ বা সংক্রমণ হলে তাকে বলা হয় সাইনোসাইটিস। নাকে আঘাত পেলে, নাকের হাড় বাঁকা, নাকে টিউমার ইত্যাদি সমস্যা এ রোগের জটিলতা আরো অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
যত কারণ
সাইনোসাইটিস বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন জীবাণুর সংক্রমণে হতে পারে, আবার অ্যালার্জির আক্রমণেও হতে পারে। অনেক সময় আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণও সাইনোসাইটিসের জন্য দায়ী থাকে। এছাড়া—
সাধারণ সর্দি-কাশি বা ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাসের সংক্রমণে সাইনোসাইটিস হতে পারে
দেহে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেলে ছত্রাক কিংবা ফাঙ্গাসের কারণেও অনেক সময় সাইনোসাইটিস হয়ে থাকে
শুষ্ক মৌসুমে ফসলের ডাস্ট, ধুলাবালি, ফুলের পরাগরেণু, পশুর পশম, দূষিত বাতাস ইত্যাদির কারণে সৃষ্ট অ্যালার্জি নাকের ভেতরের মিউকাস মেমব্রেনকে ফুলিয়ে দেয়, যার ফলে সাইনোসাইটিস হয়ে থাকে
ঠাণ্ডাজনিত কারণে সাইনোসাইটিস হতে পারে
যাদের নাকে পলিপ থাকে কিংবা নাকের হাড় বাঁকা, তারা সহজেই সাইনোসাইটিসে আক্রান্ত হতে পারে
টনসিলের প্রদাহের কারণেও সাইনোসাইটিস দেখা দিতে পারে
যেসব লক্ষণে বুঝবেন সাইনোসাইটিস
সাধারণ সর্দি-জ্বরের কারণে মাথাব্যথা হলে তাকে সাইনাসের সমস্যা মনে করার কারণ নেই। কিছু লক্ষণ দেখে অন্য সব ব্যথা থেকে সহজেই আলাদা করা যায় সাইনোসাইটিসকে। যেমন
ঠাণ্ডা লাগলে নাক ভার হয়ে থাকা এবং নাক বন্ধ মনে হওয়া
অনবরত হাঁচি হওয়া। নাকের মধ্যে চুলকানি ভাব ও পানি পড়া
মাথার সামনের অংশে ব্যথা এবং মাথা ভার ভার অনুভূত হওয়া
অনেক সময় চোখ লাল হয়ে যায় এবং চোখ দিয়ে ঘন ঘন পানি পড়ে
নাক দিয়ে গাঢ়, হলদে রঙের মিউকাস বের হওয়া
জ্বর দেখা দিতে পারে। খাবারের স্বাদ বা মুখের রুচি নষ্ট হয়ে যায়
গা ম্যাজম্যাজ করা ও মানসিক অবসাদ, এমনকি মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।
ঋতু পরিবর্তনকাল
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়। এ সময় আবহাওয়ার আদ্রতার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগা, সর্দি-জ্বর ও অ্যালার্জির প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। যে কারণে সাইনাসের প্রদাহ বেশি হয়। ফলে সাইনোসাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এ সময় বেশি থাকে। ধুলাবালি, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের সংস্পর্শে সহজেই সাইনোসাইটিস হয়। তাই যাদের ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা আছে, বিশেষ করে কোল্ড বা ডাস্ট অ্যালার্জি অথবা কোনো কারণে সাইনাসে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা বেশি সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকেন।
প্রতিরোধে যা যা করবেন
সাইনোসাইটিসের ভোগান্তি এড়াতে প্রয়োজন হয় বাড়তি সতর্কতার। তাই এ সময়—
ঠাণ্ডা হাওয়া এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ভ্রমণের সময় যাতে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস সরাসরি নাকে না যায়।
রাতে ঘুমানোর সময় এসি বা ফ্যান চালানোর ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করুন।
ঘন ঘন ঠাণ্ডা লাগাবেন না। বৃষ্টিতে ভেজা, দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করা থেকে বিরত থাকুন।
ধুলাবালি এড়িয়ে চলুন। হাঁটাচলার সময় সতর্ক থাকুন, যাতে নিশ্বাসের সঙ্গে ধুলাবালি নাকে প্রবেশ করতে না পারে।
বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরিধান করুন।
ফ্রিজের ঠাণ্ডা খাবার ও পানীয় পরিহার করুন। পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন এবং বেশি বেশি ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খান।
অ্যালার্জি উৎপাদনকারী খাবার এড়িয়ে চলুন।
মশার কয়েলের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকুন।
বারবার সাইনাসের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঘরোয়া চিকিৎসা
গরম পানির সঙ্গে মেন্থলের ভাপ নিন: সাইনোসাইটিস দেখা দিলে মাথা গামছা বা তোয়ালে দিয়ে ঢেকে ফুটন্ত গরম পানির সঙ্গে মেন্থল মিশিয়ে বাষ্প নাক দিয়ে টেনে নিন। এতে ঝাঁঝালো গন্ধে জমে থাকা মিউকাস সরে গিয়ে বন্ধ নাক খুলে যাবে এবং ব্যথা দ্রুত কমবে।
গামছা বা তোয়ালের গরম সেঁক দিন: সাইনাসের প্রদাহজনিত কারণে তীব্র মাথাব্যথা হলে ভেজা তোয়ালে গরম করে মুখ, নাক ও চোখের ওপর হালকা সেঁক দিলে ব্যথা দূর হয় ও আরাম পাওয়া যায়।
লেবু চা: ঈষদুষ্ণ লেবু পানি, লেবু চা, আদা চা বা হার্ব টি অস্বস্তি দূর করতে ভালো কাজে দেয়।
সঠিক নিয়মে নাক ঝাড়ুন: নাকে জমে থাকা সর্দি জোর করে ভেতরের দিকে টেনে নেয়া যাবে না। নাকের একপাশের ছিদ্র বন্ধ করে অন্য পাশ দিয়ে আলতো করে সর্দি পরিষ্কার করতে হবে।
যদি ঘরোয়া চিকিৎসায় সাইনোসাইটিস ভালো না হয়, লক্ষণ আরো তীব্র হয় তাহলে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন। সুস্থ থাকুন।
লেখক : হেড-নেক সার্জন ও কনসালট্যান্ট
ওটোল্যারিঙ্গোলজি-হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
নাক-কান ও গলা বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক