অসুস্থ হলে মানুষ সাধারণত ওষুধ খোঁজে, চিকিৎসকের কাছে যায়। কিন্তু মন খারাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব কিংবা জীবনের কোনো কঠিন অভিজ্ঞতায় আটকে গেলে সব সময় যে ওষুধই সমাধান—তা নয়। কখনো কখনো একটি বই, একটি গল্প কিংবা কোনো চরিত্রের জীবনের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিলও মানুষকে নিজের ভেতরের কথাগুলো নতুন করে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। এ ধারণা থেকেই বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘বিবলিওথেরাপি’—বই ও নির্বাচিত পাঠের মাধ্যমে মানসিক সুস্থতায় সহায়তা করার একটি পদ্ধতি। বর্তমান সময়ে ব্রিটেনে এ ধারণা ব্যক্তিগত পাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে লাইব্রেরি ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির অংশ হয়ে উঠেছে।
‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি এসেছে গ্রিক ‘বিবলিও’ অর্থাৎ বই এবং ‘থেরাপিয়া’ অর্থাৎ চিকিৎসা শব্দ থেকে। সহজভাবে বললে, নির্দিষ্ট মানসিক বা আবেগীয় সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বই পড়া এবং সেই পাঠের মাধ্যমে নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করাই এর মূল ধারণা। এটি নিছক বই পড়ার অভ্যাস নয়; বিশেষ করে ক্লিনিক্যাল ব্যবহারে রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে পাঠ নির্বাচন এবং পাঠ-পরবর্তী আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক অর্থে ‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মার্কিন ধর্মযাজক ও লেখক স্যামুয়েল ম্যাককর্ড ক্রোথারস। ১৯১৬ সালে তার লেখায় শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। পরে ১৯৪১ সালে ডরল্যান্ডস মেডিকেল ডিকশনারিতে এটি মানসিক স্বাস্থ্যচিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে জায়গা করে নেয়
‘বিবলিওথেরাপি’র ধারণা অবশ্য অনেক পুরনো। প্রাচীন গ্রিসে থিবসের একটি গ্রন্থাগারের প্রবেশপথে লেখা ছিল—‘আত্মার আরোগ্যের স্থান’। আবার প্রাচীন মিসরের রাজা দ্বিতীয় রামেসিসের গ্রন্থাগারকেও বলা হতো ‘আত্মা নিরাময়ের ঘর’। অর্থাৎ বই ও পাঠ যে মানুষের মানসিক জগতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এ ধারণা নতুন নয়।
আধুনিক অর্থে ‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মার্কিন ধর্মযাজক ও লেখক স্যামুয়েল ম্যাককর্ড ক্রোথারস। ১৯১৬ সালে তার লেখায় শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায়। পরে ১৯৪১ সালে ডরল্যান্ডস মেডিকেল ডিকশনারিতে এটি মানসিক স্বাস্থ্যচিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে জায়গা করে নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধাহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সৈনিকদের পুনর্বাসনে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালগুলোয় বই পড়ার ব্যবস্থা করা হতো। গল্প, আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনি, কবিতা ও ধর্মীয় বই বেছে নিয়ে তাদের পড়তে দেয়া হতো। এসব বই যুদ্ধের ভয়, একাকিত্ব ও হতাশা কাটিয়ে উঠতে অনেককে মানসিকভাবে সহায়তা করত।
সময়ের সঙ্গে বিবলিওথেরাপি দুইভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্লিনিক্যাল বিবলিওথেরাপিতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের পরামর্শে নির্দিষ্ট বই নির্বাচন করা হয়। অন্যদিকে আত্মউন্নয়নমূলক বিবলিওথেরাপিতে পাঠক নিজের প্রয়োজন ও আগ্রহ অনুযায়ী বই পড়েন। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসের সংকট, শোক কিংবা জীবনের নানা পরিবর্তনের সময় উপযুক্ত বই একজন পাঠককে নিজের অভিজ্ঞতাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করতে পারে।
বইয়ের শক্তিটা এখানেই। কোনো গল্পের চরিত্রের ভেতরে পাঠক যখন নিজের ভয়, দুঃখ কিংবা দ্বন্দ্ব খুঁজে পান, তখন নিজের অনুভূতিকে ভাষা দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাওয়া একাকিত্ব কমাতে পারে, সহমর্মিতা বাড়াতে পারে এবং আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। নিয়মিত মনোযোগী পাঠ একই সঙ্গে দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে সাময়িক বিরতিও তৈরি করে।
উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসের সংকট, শোক কিংবা জীবনের নানা পরিবর্তনের সময় উপযুক্ত বই একজন পাঠককে নিজের অভিজ্ঞতাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করতে পারে
এ ধারণা এখন আর কেবল গ্রন্থাগার বা থেরাপিস্টের কক্ষে সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাজ্যে ‘রিডিং ওয়েল’ উদ্যোগের আওতায় ‘বুকস অন প্রেসক্রিপশন’ কর্মসূচিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্দিষ্ট সমস্যায় আক্রান্ত মানুষকে নির্বাচিত বই পড়ার পরামর্শ দেন। ২০১৩ সাল থেকে দ্য রিডিং এজেন্সি ও পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর অংশীদারত্বে পরিচালিত এ উদ্যোগে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সমস্যার অভিজ্ঞতা থাকা মানুষের পরামর্শে বই নির্বাচন করা হয়। মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শের মতো নির্দিষ্ট তালিকা থেকে বই নিয়ে লাইব্রেরিতে পড়তে পারে। কর্মসূচিটির আওতায় ২০১৩ সাল থেকে ২৬ লাখের বেশি বই ধার দেয়া হয়েছে। বইয়ের মাধ্যমে মানসিক সুস্থতার ধারণাটি ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশেও বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও বিষণ্নতা নিয়ে কথা বলার সামাজিক প্রবণতা বাড়লেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো সবার নাগালের মধ্যে নয়। এমন বাস্তবতায় বইকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মানসিক সুস্থতার সহায়ক উপায় হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক লাইব্রেরিতে পাঠাভ্যাস বাড়ানো, নির্বাচিত বই নিয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর পরামর্শ—এসব উদ্যোগ মানসিক সুস্থতার পরিসরকে আরো বিস্তৃত করতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বিবলিওথেরাপি গুরুতর মানসিক রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী এটি প্রচলিত চিকিৎসা ও থেরাপির পাশাপাশি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিবিসি ও লিটারেরি হাব থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে