যা জানা জরুরি
ডায়াবেটিস কেবল বয়স্কদের হয়, এমনটা কিন্তু নয়। বরং ডায়াবেটিস হতে পারে যেকোনো বয়সেই। শিশু-কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, নারী কিংবা পুরুষ, যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে অনেক নবজাতক ডায়াবেটিস নিয়ে জন্মাচ্ছে। ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ১০-১২ শতাংশই শিশু, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত।
ডায়াবেটিসের যত ধরন
চিকিৎসকরা ডায়াবেটিসকে সাধারণত চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেন। টাইপ-১, টাইপ-২, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ও অন্যান্য নির্দিষ্ট কারণে ডায়াবেটিস। শিশু-কিশোর বা তরুণরা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসকে আগে ‘জুভেনাইল ডায়াবেটিস’ বলা হতো। বয়স্কদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস বেশি দেখা যায়। শিশু-কিশোর বা তরুণরাও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে।
শিশুদের যত ডায়াবেটিস
শিশুদের নিওনেটাল ডায়াবেটিস, মডি (MODY), টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তবে শিশুরা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে বেশি আক্রান্ত হয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন রোগ, যা দেহে পর্যাপ্ত ইনসুলিনের অভাবে হয়ে থাকে। এটি শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমায়। অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন হরমোন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোকে নষ্ট করে দেয় এবং এ কোষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ফলে দেহে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না বা খুবই অল্প মাত্রায় তৈরি হয়। ইনসুলিনের অভাবে গ্লুকোজ কোষে না গিয়ে রক্তে জমতে থাকে। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এতে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এ অবস্থাকেই টাইপ-১ ডায়াবেটিস বলা হয়। তবে বর্তমানে শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও স্থূলতার কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিসও দেখা যাচ্ছে।
কীভাবে বুঝবেন শিশুর ডায়াবেটিস আছে কিনা
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের কিছু উপসর্গ রয়েছে, যেগুলো খুব দ্রুত প্রকাশ পায়। যেমন—
অতিরিক্ত পিপাসা পাওয়া
ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া
শিশুর ওজন কমে যাওয়া ও বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া
শিশুর অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া
ক্ষত বা ঘা শুকাতে দেরি হওয়া
দৈনন্দিন কাজকর্মে অনীহা
ঘন ঘন সংক্রমণ
যেহেতু শিশুরা তাদের শারীরিক পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন নয়, তাই খেয়াল রাখুন আপনার শিশুর মধ্যে এসব উপসর্গ আছে কিনা। এসব উপসর্গ দেখা দিলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না আনলে আরো কিছু জটিলতা যেমন বমি, পেটে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ও পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় ‘ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস’।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের জটিলতা
ডায়াবেটিস হলো নীরব ঘাতক। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, যাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে। এছাড়া টাইপ-১ শরীরে ইনসুলিন তৈরি করা কোষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। শরীরে ইনসুলিনের তীব্র অভাব হলে শক্তি উৎপাদনের জন্য চর্বি ভাঙতে শুরু করে, যা রক্তে বিষাক্ত ‘কিটোন বডিস’ বা অ্যাসিড তৈরি করে, যা শিশুদের জন্য বিপজ্জনক। এছাড়া টাইপ-১ ডায়াবেটিস শিশুদের অকালে হৃৎপিণ্ড, কিডনি, চোখ, পা প্রভৃতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা বাড়ায়।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা
এখন পর্যন্ত টাইপ-১ ডায়াবেটিসের একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো ইনসুলিন গ্রহণ করা। শিশুকে প্রতিদিন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রায় ইনজেকশনের সাহায্যে ইনসুলিন দিতে হবে।
অভিভাবকদের করণীয়
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শিশুর অভিভাবকদের দায়িত্ব অনেক। পরীক্ষায় শিশুর ডায়াবেটিস নিশ্চিত হলে ভেঙে না পড়ে সাহস ও সঠিক পরামর্শ দিয়ে শিশুর পাশে থাকুন। এতে শিশু ভীত না হয়ে আত্মবিশ্বাসী হবে। শিশুর সুস্থ জীবনযাত্রা নিশ্চিতের পাশাপাশি আরো যেসব বিষয়ে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে—
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে নিয়মিত ইনসুলিন দেয়া। প্রতিদিন শিশুর গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা। মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় খুব কম বা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ইনসুলিনের মাত্রা সামঞ্জস্য করে নেয়া।
শিশুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তার ডায়াবেটিস সম্পর্কে অবগত করা, যাতে শিশু অসুস্থ হলে তারা ব্যবস্থা নিতে পারেন।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিশুর খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক সুস্থতার দিকেও গুরুত্ব দেয়া। গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একটি সুষম ও বয়স উপযোগী খাদ্যতালিকা তৈরি করে নেয়া।
শিশুকে অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত এবং চর্বি ও কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাবার না দেয়া। বিশেষ করে স্থূলতা বাড়ায় এমন ভাজাপোড়া, চিপস, চকোলেট, কোমল পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে রাখা।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে দেয়া এবং একবারে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খেতে দেয়া। পানিশূন্যতা রোধে শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পানের অভ্যাস গড়ে তোলা।
শিশুর সুস্থতার জন্য প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি বা খেলাধুলা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া। বাচ্চাকে যতটা সম্ভব মাঠে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। এতে শিশুর যেমন সুষ্ঠু মনোদৈহিক বিকাশ ঘটবে, তেমনি গ্লুকোজও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। শিশুর সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করুন, তার সঙ্গে খেলাধুলা করুন। তার আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করুন এবং সবার সঙ্গে মিশতে উৎসাহ দিন। পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা এবং দৃঢ় মনোবলের সঙ্গে সঠিক পরিচর্যা সন্তানের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মুখ্য চাবিকাঠি।
লেখক: ডায়াবেটিস, হরমোন ও থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।