নিউরন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য

মাত্র চারদিনে স্মৃতিশক্তিতে ব্যাঘাত ঘটানো শুরু করে উচ্চমাত্রার চর্বিযুক্ত জাঙ্ক ফুড

ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার ইউএনসি স্কুল অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, জাঙ্ক ফুড মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্রের গঠনকে রীতিমতো বদলে দেয়। এর ফলে মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রভাবিত হয় স্মৃতিশক্তিও। গবেষণাটি এখনো চলমান থাকলেও এর প্রাথমিক পর্যায়ের ফলাফল সম্প্রতি নিউরন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে মারাত্মক সব অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির জন্য অনেকাংশেই দায়ী করা হয় খাদ্যাভাসকে। স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের দূরারোগ্য ব্যাধির মতো অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনজনিত রোগের বড় একটি কারণ হলো অতিপ্রক্রিয়াজাত জাঙ্ক ফুডের প্রতি আসক্তি। এর বাইরে মস্তিষ্কের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে জাঙ্ক ফুড খাওয়া।

ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার ইউএনসি স্কুল অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, জাঙ্ক ফুড মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্রের গঠনকে রীতিমতো বদলে দেয়। এর ফলে মস্তিষ্কের সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রভাবিত হয় স্মৃতিশক্তিও। গবেষণাটি এখনো চলমান থাকলেও এর প্রাথমিক পর্যায়ের ফলাফল সম্প্রতি নিউরন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

ইঁদুরের ওপর চালানো ওই গবেষণায় দেখা গেছে, টানা উচ্চমাত্রার চর্বিযুক্ত জাঙ্কফুড গ্রহণের কারণে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে (মস্তিষ্কের যে অংশ স্মৃতিশক্তি বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থানিক স্মৃতিশক্তি, শিখন প্রক্রিয়া, আবেগ, আচরণসহ গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা রাখে) অবস্থিত বিশেষ এক ধরনের কোষকে মাত্র চারদিনের মধ্যেই ব্যাপক মাত্রায় সক্রিয় করে তোলে। এতে হিপোক্যাম্পাসের স্মৃতিগঠন প্রক্রিয়া ব্যাপক মাত্রায় বিঘ্নিত হয়।

নতুন এ গবেষণা স্থূলতার সঙ্গে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিভ্রংশ মোকাবেলায় প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ খুলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে ইউএনসি স্কুল অব মেডিসিনের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান গবেষক ড. জুয়ান সংয়ের নেতৃত্বে। আর গবেষণা প্রতিবেদন লেখার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. টেলর ল্যান্ড্রি।

গবেষণায় দেখা যায়, জাঙ্কফুড তথা উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাদ্য (এইচএফডি) গ্রহণের পর মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে অবস্থিত সিসিকে ইন্টারনিউরনস নামে একটি বিশেষ শ্রেণির কোষ অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর কারণ হলো এ ধরনের খাদ্য গ্রহণের কারণে মস্তিষ্কে গ্লুকোজ (চিনি) গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়। এতে কয়েক দিনের মধ্যেই হিপোক্যাম্পাসের স্মৃতিগঠন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন শুরু হয়। বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাটে ভরপুর বার্গার, ফ্রাই খাওয়ার প্রভাবে এ ধরনের সমস্যা বেশি ঘটে।

মস্তিষ্কের কোষের প্রয়োজনীয় শক্তি ব্যবহারের বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করে পিকেএম২ নামের একটি প্রোটিন। এই পিকেএম২ প্রোটিন মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে ড. জুয়ান সং বলেন, ‘আমরা জানতাম খাদ্যাভ্যাস ও বিপাক প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণে এত অল্প সময়ের মধ্যেই মস্তিষ্কের এত নির্দিষ্ট ও স্পর্শকাতর কোষে এমন পরিবর্তন দেখা যাবে, তা আমাদের ধারণায় ছিল না। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে গ্লুকোজের ঘাটতি হওয়ায় এসব কোষের কার্যকলাপে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আর এটুকুই স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করার জন্য যথেষ্ট।’

মস্তিষ্কের স্মৃতিগঠন প্রক্রিয়ায় খাদ্যের সংবেদনশীল প্রভাব এবং মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখায় পুষ্টির গুরুত্বই এ গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাদ্য যে স্মৃতিভ্রংশ ও আলঝেইমারের মতো মস্তিষ্কের নিউরোডিজেনারেটিভ বা স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে সেটিই এই গবেষণা প্রতিবেদনের অন্যতম প্রতিপাদ্য।

গবেষকরা দেখেছেন, মস্তিষ্কে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এলে নিউরনের অতিসক্রিয় কোষগুলো শান্ত হয়ে যায় এবং স্মৃতিশক্তি সংক্রান্ত সমস্যাগুলোও দূর হয়। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন বা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে স্থূলতা সংশ্লিষ্ট স্নায়ুর ক্ষয় ঠেকানো যেতে পারে। আবার উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণের পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং মস্তিষ্কের সিসিকে ইন্টারনিউরনকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা ও স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটাতে যথেষ্ট।

আরও