বয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে নানা ধরনের পরিবর্তন আসে।

অবসর গ্রহণ, শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, প্রিয়জন হারানো, একাকিত্ব, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা কিংবা দৈনন্দিন কাজের ওপর নির্ভরশীলতা—এসব কারণে অনেক বয়স্ক মানুষ মানসিকভাবে চাপ, দুশ্চিন্তা বা হতাশার মধ্যে পড়তে পারেন। তাই বয়স্কদের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেয়া জরুরি।

বয়স্কদের মানসিকভাবে ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের সময় দেয়া, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখা এবং নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করার সুযোগ তৈরি করা। পরিবারের সদস্যদের সামান্য যত্ন ও আন্তরিকতাও তাদের মানসিক সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বয়স্কদের মানসিক যত্নের উপায়

নিয়মিত সময় দেয়া: বয়স্কদের সঙ্গে প্রতিদিন কিছুটা সময় কাটানো মানসিক সুস্থতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে গল্প করুন, দিনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলুন এবং তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা শুনুন।

তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিন: বয়স বাড়লেও একজন মানুষের নিজের পছন্দ, মতামত ও সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার থাকে। তাই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাদের মতামত জানতে চাওয়া উচিত।

একাকিত্ব দূর করার চেষ্টা করুন: বয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একাকিত্ব একটি বড় সমস্যা হতে পারে। সন্তান বা পরিবারের সদস্যরা ব্যস্ত থাকলে তারা দীর্ঘ সময় একা থাকতে পারেন। আবার বন্ধু বা সমবয়সীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলেও একাকিত্ব বাড়তে পারে।

তাই নিয়মিত আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা দরকার। সম্ভব হলে তাদের আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দেয়া বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

পছন্দের কাজে সক্রিয় রাখুন: অবসর নেয়ার পর অনেক বয়স্ক মানুষ হঠাৎ করেই দৈনন্দিন ব্যস্ততা হারিয়ে ফেলেন। এতে তাদের মধ্যে একঘেয়েমি বা অপ্রয়োজনীয়তার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তাই তাদের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন পছন্দের কাজে যুক্ত রাখা ভালো। যেমন বাগান করা, বই বা পত্রিকা পড়া, গান শোনা বা গাওয়া।

প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ দিন: প্রকৃতির মধ্যে কিছুটা সময় কাটানো অনেকের মন ভালো করতে পারে। বাড়ির বাগান, ছাদবাগান, পার্ক কিংবা খোলা জায়গায় নিরাপদে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ দেয়া যেতে পারে।

গাছপালার যত্ন নেয়া, ফুল দেখা, পাখির ডাক শোনা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাইরে বসে গল্প করার মতো ছোট ছোট অভ্যাসও তাদের দৈনন্দিন জীবনে আনন্দ যোগ করতে পারে।

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন: বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘুমের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। কেউ রাতে ঘুমাতে পারেন না, আবার কেউ দিনের বেলায় বেশি ঘুমিয়ে রাতে জেগে থাকতে পারেন।

দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকলে নিজের ইচ্ছায় ঘুমের ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত?

মানসিক পরিবর্তন যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকে, ক্রমেই বাড়তে থাকে বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি যদি নিজের জীবন নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেন, নিজেকে বোঝা মনে করেন বা নিজের ক্ষতি করার কথা বলেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিতে হবে।

পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

বয়স্কদের মানসিক সুস্থতার জন্য সবসময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের একটু সময় দেয়া, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা, পছন্দের খাবার তৈরি করা, একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া কিংবা পুরনো স্মৃতি নিয়ে গল্প করাই তাদের জন্য অনেক আনন্দের হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের যেন মনে না হয় যে বয়সের কারণে তারা পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে গেছেন। বরং তাদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও উপস্থিতিকে মূল্য দিতে হবে

আরও