নারীদের হৃদরোগ নিয়ে পাঁচ ভুল ধারণা— অজান্তেই বাড়তে পারে ঝুঁকি

হৃদরোগ সাধারণত হঠাৎ তৈরি হয় না। এর পেছনে বছরের পর বছর ধরে কাজ করতে পারে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো বিষয়

হয়তো ভাবছেন, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, খাবারেও সচেতন—তাহলে হৃদরোগের ভয় কী? অথবা মনে হতে পারে, বয়স কম কিংবা তীব্র বুকব্যথা হচ্ছে না; তাই হৃদ‌যন্ত্র নিয়ে চিন্তারও কারণ নেই। কিন্তু এসব ধারণাই নারীদের হৃদস্বাস্থ্যের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

একজন নারী দেখতে পুরোপুরি সুস্থ হলেও তার হৃদরোগ থাকা অস্বাভাবিক নয়। আবার হৃদযন্ত্রের সমস্যার লক্ষণও সবসময় বুকে তীব্র ব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা পিঠ, ঘাড় ও চোয়ালে ব্যথার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

বুঝতেই পারছেন— যে লক্ষণগুলোকে অনেকে সাধারণ ক্লান্তি, বদহজম বা অন্য কোনো সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, সেগুলো কখনো কখনো হৃদরোগের সতর্কবার্তাও হতে পারে। ভারতীয় চিকিৎসক বিনয় কুমারের মতে, নারীদের হৃদরোগ নিয়ে প্রচলিত বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। আর এসব ধারণার কারণে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।

তাহলে কোন ধারণাগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার?

মিথ এক: নারীদের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি কম

বাস্তবতা: মেনোপজের আগে কিছুটা সুরক্ষা থাকলেও নারীরা হৃদরোগের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন। নারীদের জীবনের শুরুর দিকে ইস্ট্রোজেন হৃদরোগের বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে মেনোপজের পর, এই ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে বিষয়টি শুধু বয়স বা হরমোনের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। নারীদের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থাও হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস।

এক্ষেত্রে অটোইমিউন ডিজিজ এবং পিসিওএসের মতো সমস্যাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। একইভাবে ধূমপান ও মুখে খাওয়ার গর্ভনিরোধক ওষুধের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ ব্যবহারের পাশাপাশি ধূমপান করলে রক্ত জমাট বাঁধা, স্ট্রোক ও হৃদযন্ত্রের জটিলতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। অর্থাৎ, নারী হওয়া মানেই হৃদরোগের ঝুঁকি নেই—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।

মিথ দুই: হৃদরোগ শুধু বেশি বয়সে হয়

বাস্তবতা: বয়স গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটিই একমাত্র বিষয় নয়।

হৃদরোগ সাধারণত হঠাৎ তৈরি হয় না। এর পেছনে বছরের পর বছর ধরে কাজ করতে পারে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো বিষয়।

চিকিৎসক বিনয় কুমার বলেন, হৃদরোগ তৈরি হতে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। তাই বেশি বয়সে রোগটি ধরা পড়লেও এর প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু হয়ে থাকতে পারে।

তাই বয়স কম বলে ঝুঁকি একেবারে নেই—এমন ধারণা ঠিক নয়। বিশেষ করে পরিবারের কারো হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি আরো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নিজের ঝুঁকিগুলো আগে থেকেই জানা থাকলে সতর্ক হওয়া সহজ হয়। নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

মিথ তিন: পাতলা গড়ন বা ফিট থাকলে নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি নেই

বাস্তবতা: বাইরে থেকে শরীরের গড়ন বা ফিটনেস দেখে হৃদযন্ত্রের অবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

রোগা একজন নারীরও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরল থাকতে পারে। এর সঙ্গে জিনগত কারণও হৃদরোগের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাবার অবশ্যই হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে এসব অভ্যাস থাকলেও হৃদরোগের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। এক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস এবং পারিবারিক ইতিহাসের মতো বিষয়গুলোরও বড় ভূমিকা রাখে। তাই আয়নায় নিজেকে ফিট দেখালেই যে হৃদরোগের ঝুঁকি নেই, তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।

মিথ চার: তীব্র বুকব্যথা না হলে হৃদরোগের সমস্যা নেই

বাস্তবতা: নারীদের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণাগুলোর একটি হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের সময় নারীদের বুকের অস্বস্তি হতে পারে। তবে হৃদরোগের উপসর্গ শুধু বুকব্যথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, পেটে অস্বস্তি কিংবা পিঠ, কাঁধ, ঘাড় বা চোয়ালেও ব্যথা হতে পারে।

এসব উপসর্গকে অনেক সময় হৃদযন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয় না। অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্টকে মনে হতে পারে শুধু ক্লান্তি, আর বমি বমি ভাবকে মনে হতে পারে বদহজম। এতে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হতে পারে।

তাই হঠাৎ শুরু হওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী এমন কোনো উপসর্গ, যা হৃদরোগের ইঙ্গিত হতে পারে, তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া জরুরি।

মিথ পাঁচ: পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি কমানোর উপায় নেই

বাস্তবতা: পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তবে পরিবারে হৃদরোগ থাকলেই নিজেরও হৃদরোগ হবে, এমন নয়।

বরং পারিবারিক এমন ইতিহাস থাকলে নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন। রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা, ওজন, শারীরিক সক্রিয়তা ও খাবারের অভ্যাসের দিকে নজর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপানও হৃদরোগের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

কারো জিনগত ঝুঁকি কম থাকলেও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা ধূমপানের মতো অন্য কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার মেনোপজের পর নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তাই পরিবারের ইতিহাস জানা মানে হাল ছেড়ে দেয়া নয়। বরং নিজের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে আরো সচেতন হতে হবে।

আরও