সোরিয়াসিস কেন হয়? নিয়ন্ত্রণে যা করবেন

সোরিয়াসিস ত্বকের একটি অটোইমিউন বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ত্রুটিজনিত রোগ, যা ত্বকের কোষের অস্বাভাবিক বিভাজনের ফলে হয়।

সোরিয়াসিস ত্বকের প্রদাহজনিত দীর্ঘমেয়াদি একটি রোগ। এটি কোনো ছোঁয়াচে বা সংক্রামক ব্যাধি নয়। নারী-পুরুষ যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগ পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ জীবনযাপন করা যায়।

সোরিয়াসিস কী?

সোরিয়াসিস ত্বকের একটি অটোইমিউন বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ত্রুটিজনিত রোগ, যা ত্বকের কোষের অস্বাভাবিক বিভাজনের ফলে হয়। শরীরে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করা রক্তের শ্বেতকণিকা যদি ভুল করে সুস্থ কোষগুলোকে আক্রমণ করে, তখন কোষের চক্র বা বৃদ্ধির গতি দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে নতুন সৃষ্ট কোষগুলো ত্বকের ওপর খসখসে, লালচে ও সাদাটে আঁশের আস্তরণ সৃষ্টি করে, যা সোরিয়াসিস নামে পরিচিত।

কারণ

বংশগত বা জিনগত ইতিহাস এবং শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি ছাড়া সোরিয়াসিসের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো অজানা। বাবা-মায়ের যেকোনো একজনের সোরিয়াসিস থাকলে বংশানুক্রমিকভাবে সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। যেহেতু এ রোগ একবার হলে আর পুরোপুরি সেরে যায় না, তাই কিছু নির্দিষ্ট কারণে সোরিয়াসিসের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে। যেমন—

 শরীরে যেকোনো সংক্রমণ, যেমন গলায় বা ত্বকে ইনফেকশন হলে।

 আঘাতজনিত কারণে ত্বক কেটে বা ছিলে গেলে কিংবা পোকামাকড় কামড় দিলে।

 তীব্র ঠাণ্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় বসবাস করলে। যে কারণে শীতকালে সোরিয়াসিসের প্রকোপ বেড়ে যায়।

 অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা হতাশার কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেলে।

 ধূমপান ও মদ্যপান সোরিয়াসিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এবং এর তীব্রতা দীর্ঘস্থায়ী করে।

 কিছু ওষুধের প্রভাব; যেমন উচ্চ রক্তচাপ, লিথিয়াম ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের ওষুধ সোরিয়াসিসের উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।

ধরন

সোরিয়াসিসের বেশকিছু ধরন রয়েছে। অবস্থান ও লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসকরা সোরিয়াসিসকে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করে থাকেন। যেমন—

ত্বকে শুষ্ক ও আঁশযুক্ত চাকা তৈরি হলে তাকে প্লেক সোরিয়াসিস বলে। ফলে তীব্র চুলকানি ও ব্যথা হতে পারে। এগুলো সাধারণত কনুই, হাঁটু, কোমর ও মাথার ত্বকে বেশি দেখা যায়। এছাড়া হাত ও পায়ের নখও সোরিয়াসিসে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে নখে ছোট ছোট গর্ত হওয়া, নখের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, রঙ নষ্ট হওয়া কিংবা নখ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

শিশু ও তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায় গাট্টেট সোরিয়াসিস। এটি মূলত স্ট্রেপ থ্রোটের মতো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের পর শরীরে প্রকাশ পায় এবং দেখতে ছোট ছোট জলের ফোঁটার মতো ও আঁশযুক্ত হয়।

শরীরের ভাঁজযুক্ত স্থানগুলোয় যেমন কুঁচকি, নিতম্ব ও স্তনের নিচে মসৃণ, লালচে ছোপের মতো ইনভার্স সোরিয়াসিস দেখা যায়।

সোরিয়াসিসের সবচেয়ে বিরল রূপ হলো এরিথ্রোডার্মিক সোরিয়াসিস। ফলে পুরো শরীরের ত্বক লাল হয়ে যায় এবং তীব্র চুলকানি বা জ্বালাপোড়াসহ চামড়া উঠে যাওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়।

লক্ষণ

উপসর্গ ব্যক্তিভেদে এবং ত্বকের রঙ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

 ত্বকে রুপালি আঁশযুক্ত পুরু, লালচে বা গোলাপি খসখসে চাকা তৈরি হয়, যা মাথায় হলে খুশকির মতো দেখায়।

 ত্বকের রঙের ভিন্নতার কারণে চাকাগুলো গোলাপি বা লাল অথবা বেগুনি হতে পারে এবং ধূসর রঙের আঁশের মতোও দেখা যায়।

 আক্রান্ত স্থানে তীব্র শুষ্কতা, চামড়া ফেটে যাওয়া এবং চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা ব্যথা হয়।

 অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলাভাব বা শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়, যাকে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস বলে।

চিকিৎসা পদ্ধতি

সোরিয়াসিস সম্পূর্ণ নিরাময় করার কোনো স্থায়ী প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। তবে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা নিলে তা নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব। মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার সোরিয়াসিসের চিকিৎসায় কর্টিকোস্টেরয়েড ক্রিম, ভিটামিন-ডি অ্যানালগ, রেটিনয়েড বা কোল টার সমৃদ্ধ শ্যাম্পু ও লোশন ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়।

যখন শুধু ওষুধে কাজ হয় না, তখন নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় অতিবেগুনি আলোক রশ্মি প্রয়োগ করে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে কমিয়ে আনা হয়, যাকে বলা হয় ফটোথেরাপি। এছাড়া তীব্র মাত্রার সোরিয়াসিসের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যাকে স্বাভাবিক করতে মুখে খাওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ও ইনজেকশন দেয়া হয়।

দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে সোরিয়াসিসের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এজন্য মানতে হবে কিছু নির্দেশনা—

 গোসলের পর নিয়মিত ভ্যাসলিন, নারকেল তেল বা ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার দিয়ে ত্বক নরম রাখতে হবে, যাতে ত্বক শুষ্ক হয়ে ফাটল না ধরে।

 গরু ও খাসির মাংস, দুগ্ধজাত খাবার, টমেটো এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করে বাদাম, সামুদ্রিক মাছ, রঙিন শাকসবজি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত ফল খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে।

 হাঁটা ও ব্যায়ামের মাধ্যমে মন শান্ত রাখতে হবে।

 ধূমপান ও মদ্যপান পুরোপুরি বর্জন করতে হবে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

সোরিয়াসিস নিয়ে সামাজিক ভীতি বা কুসংস্কারে কান দেবেন না। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, সুস্থ থাকুন।

লেখক: চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ

লেজার ও হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন

ল্যাবএইড অ্যাস্থেটিক অ্যান্ড লেজার লাউঞ্জ

আরও