ব্লাড ইনফেকশন

ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

রক্তে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ব্লাড ইনফেকশনের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে ছত্রাক, পরজীবী ও ভাইরাল সংক্রমণের কারণেও ব্লাড ইনফেকশন দেখা দেয়।

রক্তে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ব্লাড ইনফেকশনের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে ছত্রাক, পরজীবী ও ভাইরাল সংক্রমণের কারণেও ব্লাড ইনফেকশন দেখা দেয়। রক্তে সংক্রমণ সৃষ্টি হলে সময়মতো চিকিৎসা নিতে হয়। লক্ষণ দেখা দেয়ার পরও অবহেলা করলে জটিলতা আরো বেড়ে যায়। ফলে শরীরের অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। চিকিৎসাবিহীন রক্ত সংক্রমণ কখনো কখনো মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

ব্লাড ইনফেকশন

জীবাণু, ছত্রাক ও পরজীবী রক্তে প্রবেশের পর যখন রক্তপ্রবাহে মিশে যায় এবং ছড়িয়ে পড়ে সেই অবস্থাকে রক্ত সংক্রমণ বলা হয়। শরীরের বেশকিছু রোগের কারণেও রক্তে সংক্রমণ সৃষ্টি হতে পারে। সার্জারিতে অপরিচ্ছন্ন যন্ত্রাংশের ব্যবহার, শরীরের পোড়া অংশ, ভাঙা ও কাটাছেঁড়া স্থান এবং দাঁতের ফোড়া থেকেও রক্তে ক্ষতিকর উপাদান প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এ সংক্রমণ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়।

লক্ষণ ও উপসর্গ

তীব্র জ্বর

ভীষণ ঠাণ্ডা অনুভব করা ও কাঁপুনি হওয়া

নিম্ন রক্তচাপ, অবসাদ ও বিষণ্নতা

অস্বাভাবিক ঘাম হওয়া, ক্লান্তি ও দুর্বলতা

ঘন ঘন প্রস্রাবের তাগিদ অনুভব করা কিংবা প্রস্রাবের চাপ অনেক কমে যাওয়া

দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও নিশ্বাস ছোট হয়ে আসা

শরীরে ব্যথা ও অস্বস্তি ভাব।

ব্লাড ইনফেকশনের ধরন

ব্যাকটারেমিয়া

রক্তে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের পর প্রাথমিক অবস্থাকে বলা হয় ব্যাকটারেমিয়া। অনেক সময় এর কোনো লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পায় না। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভালো থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের শরীর এসব ব্যাকটেরিয়াকে মোকাবেলা করে থাকে। তবে এ সমস্যায় কখনো কখনো সামান্য জ্বর দেখা দিতে পারে।

সেপ্টিসেমিয়া

ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে প্রবেশের পর যখন পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র সংক্রমণ সৃষ্টি করে সেই অবস্থাকে সেপ্টিসেমিয়া বলা হয়। ফলে শরীরে তীব্র জ্বর, কাঁপুনি, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, ক্লান্তি ও অবসাদ দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি সেপসিসের মতো জটিল পরিস্থিতিতে পরিণত হতে পারে।

সেপসিস

রক্তে সংক্রমণ সৃষ্টি হলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটি প্রতিহত করতে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে শরীরের কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকঠাক কাজ করতে পারে না। যার ফলে নিম্ন রক্তচাপ, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসা, প্রস্রাবের ধরনে পরিবর্তন, শ্বাসকষ্ট ও জ্ঞান হারানোর মতো নানাবিধ জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেপসিস আরো জটিল আকার ধারণ করলে সেপটিক শকে পরিণত হয়। যে অবস্থায় রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কারা আছেন ঝুঁকিতে?

যেকোনো বয়সী মানুষ, নারী ও পুরুষ যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে কিছু বিষয় রয়েছে যা এতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে তোলে। সেগুলো হলো—

অস্ত্রোপচারের সময় অপরিচ্ছন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

যারা আগে সেপ্টিসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

শরীরে কোথাও পোড়া-স্থান কিংবা কাটা ও ভাঙার ক্ষত থাকলে সেখানে জীবাণুর প্রবেশ ঘটতে পারে।

শরীরে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

দাঁতের গোড়ায় ফোড়া, কিডনি রোগ, নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদেরও ব্লাড ইনফেকশনের ঝুঁকি বেশি থাকে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

রক্তে ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাকের উপস্থিতি শনাক্তকরণে ব্লাড কালচার টেস্ট করা হয়। রক্তপ্রবাহে ব্যাকটারেমিয়া ও ছত্রাকের সংক্রমণ নির্ণয় করতে ব্লাড কালচার টেস্ট খুবই কার্যকর একটি পদ্ধতি। শ্বেত রক্তকণিকা ও অন্যান্য রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে সংক্রমণ নির্ণয় করা যায়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রক্তে সংক্রমণ নিশ্চিত হলে দ্রুত সুচিকিৎসা নিতে হয়। যাতে সেপসিসের মতো মারাত্মক অবস্থায় পরিণত না হয়। ব্যাকটেরিয়ার কারণে রক্তে সংক্রমণ হলে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। ব্যাকটেরিয়ার ধরনের ওপর ভিত্তি করে অ্যান্টিবায়োটিক নির্ধারণ করা হয়। আর যদি ভাইরাস বা ছত্রাকের কারণে সংক্রমণ সৃষ্টি হয় সেক্ষেত্রে অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল-জাতীয় ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।

প্রতিরোধে করণীয়

শরীরের পোড়া ক্ষত এবং ভাঙা ও কাটাছেঁড়া অংশ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কোনোভাবেই এসব অংশ যাতে জীবাণুর সংস্পর্শে না আসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দাঁতের সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এটি রক্ত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এবং নানা ধরনের রোগে ভুগছেন তাদের ঝুঁকি এড়াতে সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রাত্যহিক জীবনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: হেমাটোলজি অ্যান্ড বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

রক্তরোগ, মেডিসিন ও ব্লাড ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ল্যাবএইড হাসপাতাল

আরও