অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমে শিশুর ঝুঁকি

‘‌ভার্চুয়াল অটিজম’ নিয়ে সচেতনতা জরুরি

বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুদের জীবনে মোবাইল, ট্যাব ও টেলিভিশনের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

এ প্রেক্ষাপটে অনেক বাবা-মা একটি নতুন শব্দ শুনছেন ‘‌ভার্চুয়াল অটিজম’। এটি কোনো স্বীকৃত মেডিকেল ডায়াগনোসিস নয়; বরং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে অটিজমসদৃশ কিছু আচরণ ও যোগাযোগগত সমস্যাকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ শিশুটি জন্মগতভাবে অটিজমে আক্রান্ত না হলেও পরিবেশগত প্রভাবে তার আচরণে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যা অটিজম লক্ষণের সঙ্গে প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ।

ধরা যাক, দুই বছরের একটি শিশু দিনের অধিকাংশ সময় মোবাইল বা ট্যাব হাতে বসে কার্টুন দেখছে। তাকে নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না, চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করছে না, নিজের প্রয়োজন বোঝাতে কথা না বলে হাত বা জামা ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বাইরে গেলে সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মেলামেশায় অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মোবাইল হাতে পেলেই সে শান্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এটিকে ইতিবাচক ভেবে নেন ‘‌ও তো মোবাইলে সব বুঝতে পারে’ কিন্তু বাস্তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হতে পারে।

স্ক্রিননির্ভর পরিবেশে শিশুকে কোনো প্রকার সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হয় না। সেখানে না আছে অপেক্ষা, না আছে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া, না আছে আবেগ-অনুভূতি বোঝার প্রয়োজন। ফলে বাস্তব জীবনের যোগাযোগ দক্ষতা; যেমন ভাষা ব্যবহার, চোখে চোখ রেখে কথা বলা, অন্যের অনুভূতি বোঝা। এসবের চর্চা কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভাষা বিকাশে বিলম্ব, সামাজিক যোগাযোগে দুর্বলতা, নিজের জগতে ডুবে থাকা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেয়া, কিংবা ইশারা ও শব্দের মাধ্যমে চাহিদা প্রকাশে অক্ষমতার মতো সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

তবে আশার কথা হলো, ‘‌ভার্চুয়াল অটিজম’-এর ক্ষেত্রে সমস্যা অনেকাংশেই পরিবেশগত হওয়ায় সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে উন্নতির সম্ভাবনা বেশি। স্ক্রিন টাইম কমিয়ে শিশুকে বাস্তবমুখী কার্যক্রমে যুক্ত করা। যেমন খেলাধুলা, গল্প বলা, বই দেখা, বাইরে ঘোরাঘুরি, সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা। এসবের মাধ্যমে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। কারণ শিশুর মস্তিষ্ক বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার জন্যই সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই বছরের নিচে শিশুদের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা উচিত। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও স্ক্রিন টাইম সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় শিশুকে চুপ করানোর সহজ উপায় হিসেবে মোবাইল ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। বরং শিশুর কান্নার বা বিরক্তির সময় তাকে কোলে নেয়া, কথা বলা, খেলায় যুক্ত করা। এসবই তার মানসিক ও ভাষাগত বিকাশে সহায়ক।

প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা শিশুর সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লোরে বসে খেলাধুলা করা, ব্লক দিয়ে কিছু তৈরি করা, রান্নাঘরে ছোট কাজে যুক্ত করা, বইয়ের ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন করা ‘‌এটা কী?’, ‘‌বিড়ালটা কী করছে?’ এসব কার্যক্রম শিশুর ভাষা ও চিন্তাশক্তি উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বাইরে গিয়ে গাছ, গাড়ি, মানুষ দেখিয়ে কথা বলাও শিশুর বাস্তব অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করে। মনে রাখতে হবে, শিশুর সঙ্গে কথা বলা মানে শুধু শব্দ শেখানো নয়; এটি একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।

যদি দেখা যায়, দুই বছর পার হওয়ার পরও শিশু কথা বলছে না, নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না, কিংবা চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করছে না, তাহলে দেরি না করে একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি। ‘‌সময় হলে ঠিক হয়ে যাবে’ এ ধারণার ওপর নির্ভর করে অপেক্ষা করলে মূল্যবান সময় নষ্ট হতে পারে। শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য প্রথম পাঁচ বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণই তার ভবিষ্যৎ বিকাশের ভিত্তি গড়ে দেয়।

অতএব প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে স্ক্রিনের বদলে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকেই অগ্রাধিকার দেয়া সময়ের দাবি।

লেখক: কনসালট্যান্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট

ইনসাফ বারাকা কিডনি ও জেনারেল হাসপাতাল

সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক

স্পিচ এইড বাংলাদেশ লিমিটেড

আরও