আমাদের দেশে মার্চ-এপ্রিল ও আগস্ট-সেপ্টেম্বরে টাইফয়েডের প্রকোপ বাড়ে। সাধারণত বর্ষাকালে টাইফয়েড বেশি ছড়ায়। ভারি বর্ষণ বা বন্যাজনিত জলাবদ্ধতা পানিদূষণের জন্য বেশি দায়ী। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু ও হামের পাশাপাশি টাইফয়েডের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের প্রাথমিক লক্ষণগুলো (যেমন তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা) কাছাকাছি হওয়ায় মানুষ চিকিৎসা নিতে বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাই টাইফয়েড মোকাবেলায় চাই সচেতনতা
টাইফয়েড কেন হয়
পানিবাহিত রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম টাইফয়েড। ডায়রিয়া ও কলেরার পরই এর স্থান। সালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এ রোগ ছড়ায়। এর দুটি টাইপ রয়েছে। একটি সালমোনেলা টাইফি, অন্যটি সালমোনেলা প্যারাটাইফি। দুই ধরনের সংক্রমণের লক্ষণ প্রায় একই। দূষিত পানি ও অনিরাপদ পচা-বাসি খাবারের মাধ্যমে এ ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে রক্তের সঙ্গে মিশে অন্ত্রে চলে যায় এবং সংক্রমণ ঘটায়। এর জন্য দায়ী যেসব কারণ—
অনিরাপদ ও দূষিত পানি পান
পচা-বাসি খাবার গ্রহণ
কাঁচা বা খোলা পায়খানা ব্যবহার
টাইফয়েডকবলিত এলাকা ভ্রমণ
আক্রান্ত ব্যক্তির খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ
সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহৃত টয়লেট অন্যদের ব্যবহার
টয়লেট থেকে এসে খাবার পরিবেশন ও খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার না করা
অস্বাস্থ্যকর হোটেল, রেস্তোরাঁ বা রাস্তার পাশের খোলা খাবার খাওয়া
শহরগুলোর দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা
এছাড়া টাইফয়েড থেকে আরোগ্য লাভ করার পর অনেকের পিত্তথলিতে এ জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে এবং তার মাধ্যমে অন্যদের শরীরে ছড়াতে পারে
কীভাবে চিনবেন টাইফয়েড
টাইফয়েডের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার ৬-৩০ দিন পর অন্যান্য সাধারণ জ্বরের মতো লক্ষণ দেখা দেয়। ফলে প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয় কঠিন হয়। শুরুর দিকে এ রোগের যেসব লক্ষণ দেখা যায়—
ধীরে ধীরে জ্বর বাড়তে থাকা
জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা
শরীর ম্যাজম্যাজ করা এবং ক্লান্তি ভাব
ক্ষুধামান্দ্য
শিশুদের প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে ডায়রিয়া এবং বয়স্কদের কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে
জ্বরের সঙ্গে পেটব্যথা
খুশখুশে শুষ্ক কাশি
শিশুদের ক্ষেত্রে বমি, ডায়রিয়া ও পেটব্যথা আরো স্পষ্ট হতে পারে
অবস্থা জটিল হলে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়
১০৩-১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর হয়
পেট ফাঁপা অনুভূত
মারাত্মক ডিহাইড্রেশন হয়
কারো কারো ত্বকে ফুসকুড়ি বা গোলাপি রঙের দাগ হতে পারে
অবস্থা জটিলতর হলে রোগী প্রলাপ বকে এবং হ্যালুসিনেশন বা ভ্রম হয়। যাকে বলা হয় ‘টাইফয়েড স্টেট’
সবচেয়ে বিপজ্জনক যে জটিলতা দেখা দেয়, তা হলো অন্ত্রে রক্তক্ষরণ বা অন্ত্রে ছিদ্র হয়ে যাওয়া
প্রতিরোধে যা যা করবেন
বর্তমানে টাইফয়েডের টিকা আবিষ্কার হয়েছে। তবু টাইফয়েড প্রতিরোধে সচেতনতা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাই সবচেয়ে কার্যকরী উপায়।
টাইফয়েড মোকাবেলায় বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পানের বিকল্প নেই। সাপ্লাইয়ের পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে পান করুন। রান্নার জন্য পুকুর বা জলাশয়ের পানি ব্যবহার করলে অবশ্যই ফিটকিরি বা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিন।
টাইফয়েডের ঝুঁকিমুক্ত থাকতে নিরাপদ ও ভালোভাবে সেদ্ধ করা খাবার খান। রাস্তার পাশের লোভনীয় স্ট্রিট ফুডস খাওয়ার আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও হাইজিন সম্পর্কে সর্তক থাকুন।
কাঁচা ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খান। খাওয়ার পূর্বে ফলের খোসা ছাড়িয়ে নিন।
শিশুদের স্কুলে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের বিষয়ে সর্তক হোন।
কাঁচা ও খোলা টয়লেটের পরিবর্তে স্বাস্থ্যসম্মত পাকা টয়লেট ব্যবহার করুন।
টয়লেট ব্যবহারের পরে, খাবার রান্না বা পরিবেশনের আগে এবং খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
নিজে টাইফয়েডের টিকা নিন এবং শিশুদেরও দিন।
পরিবারের কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে তার ব্যবহৃত থালা-বাসন, তোয়ালে আলাদা রাখুন। তার ব্যবহৃত টয়লেট ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। রোগীকে বিশ্রামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল খাবার যেমন ডাবের পানি, স্যুপ, ফলের জুস খেতে দিন।
কখন যাবেন ডাক্তারের কাছে
যদি টাইফয়েড আক্রান্ত অঞ্চল ভ্রমণকালীন বা ফিরে আসার পর জ্বরে আক্রান্ত হন
পরিবারের কোনো সদস্যের টাইফয়েড ধরা পড়েছে এমন কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে
জ্বর দুই-তিনদিনের বেশি স্থায়ী হলে এবং ১০২° ফারেনহাইট অতিক্রম করলে
জ্বরের সঙ্গে পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে
এ রোগের জটিলতা কম নয়। রক্তক্ষরণ, অগ্নাশয়ে প্রদাহ, মেরুদণ্ডে সংক্রমণ এমনকি কিডনিতেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে টাইফয়েড থেকে। চিকিৎসা বিলম্ব হলে বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। টাইফয়েডের সঠিক চিকিৎসা না হলে শিশুদের মস্তিষ্কে প্রদাহ, হেপাটাইটিস, পিত্তথলিতে ইনফেকশন এবং অন্ত্রে ছিদ্র হয়ে রক্তক্ষরণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো টাইফয়েড দিন দিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। তাই এ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন।
লেখক : সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়া
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান