বাতব্যথা

শীতকালে বাতব্যথা প্রতিরোধে করণীয়

৫৫ বছর বয়সী সাবেরা বেগমের সঙ্গী এখন তার ছয় বছরের নাতনি তিতলি।

৫৫ বছর বয়সী সাবেরা বেগমের সঙ্গী এখন তার ছয় বছরের নাতনি তিতলি। ১০টা-৫টা অফিস করা মায়ের চেয়ে তিতলির বেশি সময় কাটে তার দাদির সঙ্গে। শীত আসার পর থেকেই তিনি তিতলিকে খেলতে নিয়ে যেতে পারছেন না। হাঁটুর জয়েন্টের ব্যথা বেড়েছে। মাঝেমধ্যেই জ্বর আসছে। প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তিতে তিনি শয্যাশায়ী। সাবেরা বেগমের মতো অনেকেই এমন ‍সমস্যায় ভোগেন। সাধারণত বয়স চল্লিশের কোঠা পেরোলেই বেড়ে যায় আর্থ্রাইটিসের আশঙ্কা। পুরুষের তুলনায় নারীরা এতে আক্রান্ত হন বেশি। শীতকালে ঠাণ্ডার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে বাত, আর্থ্রাইটিসের ব্যথা। এ সময় তাপমাত্রা যত কমে, ব্যথা ততই বাড়ে।

শীতে কি সব ব্যথাই বাড়ে

গরমে বাতসহ অন্যান্য ব্যথা কমলেও শীতে যেকোনো ব্যথার মাত্রা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে চল্লিশোর্ধ্ব নারী ও পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষরা যারা বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুগছেন তাদের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া জয়েন্ট বা বাতব্যথা, পেশি, লিগামেন্ট, হাড় ও স্নায়ুর ব্যথা তীব্ররূপ ধারণ করে।

যেসব কারণে শীতে ব্যথা বাড়ে

বয়স ও শীতের কম-বেশির সঙ্গে দেহের ব্যথা-বেদনার সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা রকম জটিলতা দেখা দিতে থাকে। ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ পদার্থের ঘাটতি দেখা দেয়। হাড়ের ক্ষয় বৃদ্ধি পায়। লিগামেন্টের নমনীয়তা হ্রাস পায়। জয়েন্ট ফুলে যায়। অন্যদিকে শীতে স্বাভাবিক নড়াচড়া কম হয় এবং অনেকেই এ সময় শরীরচর্চা থেকে বিরত থাকেন। ফলে সব ধরনের ব্যথা এ সময় বেড়ে যায়। তীব্র ঠাণ্ডায় জয়েন্ট জমে গিয়ে ব্যথার উদ্রেক হয়। শরীরের পেশি ও হাড়ে রক্ত চলাচল কমে যায়। স্নায়ুর সহ্যক্ষমতাও কম থাকে। বেড়ে যায় ব্যথার অনুভূতি।

শীতে বাতব্যথা

আর্থ্রাইটিস বা বাতব্যথায় অস্থিসন্ধি এবং এর আশপাশের মাংশপেশিতে ব্যথা হয়। শীতকাল আর্থ্রাইটিসের রোগীদের বেশ খারাপই কাটে। ৬৫ বা তার চেয়ে বেশি বয়স্ক মানুষ এবং ৪৫-এর বেশি বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। যারা একটু অলস প্রকৃতির এবং ধূমপান ও মদ্যপান করেন, অন্যদের চেয়ে তাদের আক্রান্তের হার অনেক বেশি।

লক্ষণ ও উপসর্গ

হাতে-পায়ে ব্যথা বা অবশ হয়ে আসা, ক্লান্তি, জ্বর জ্বর ভাব, চোখ লাল হয়ে যাওয়া আর্থ্রাইটিসের প্রাথমিক লক্ষণ। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। হাত, কবজি ও পায়ে যন্ত্রণা হতে থাকে। অতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছলে ত্বক, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিতে সমস্যা হতে পারে।

নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা দেয়—

  • অস্থিসন্ধি ও চারপাশের মাংশপেশিতে প্রদাহ
  • অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়া ও আকৃতিতে পরিবর্তন আসা।
  • চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
  • বুকে ব্যথা।
  • হাঁটাচলায় জড়তা।
  • অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা।
  • মাঝে মাঝে জ্বর হওয়া।
  • হঠাৎ ওজন কমতে থাকা।

করণীয়

শীতে আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে শরীরে ঠাণ্ডা লাগতে না দেয়া। এ সময় বাইরে গেলে পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরার পাশাপাশি হাত-পায়ে মোজা এবং গলায় মাফলার ব্যবহার করতে হবে। শীতকালে সবুজ শাকসবজি ও সুষম খাদ্য গ্রহণে আর্থ্রাইটিস বা বাতব্যথার তীব্রতা কমে আসে।

  • আর্থ্রাইটিসের ব্যথায় হালকা ব্যায়াম খুব কার্যকর। এ রোগে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত ব্যায়াম করবেন।
  • বেশি ব্যথা হলে অন্তত সাতদিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম নিন।
  • নরম বিছানার পরিবর্তে শক্ত ও সমান বিছানায় ঘুমান।
  • মেরুদণ্ড ও ঘাড় নিচু করে কোনো কাজ করবেন না। মোড়া, পিঁড়ি বা মেঝেতে না বসে মেরুদণ্ড সোজা করে চেয়ারে বসুন।
  • কুসুম গরম পানির সেঁক নেবেন। এতে ভালো উপকার পাওয়া যায়।
  • হিটেড সুইমিংপুলে সাঁতার কাটলে জয়েন্টের ব্যথায় উপকার পাওয়া যাবে।
  • রাতে ঘুমানোর আগে কুসুম গরম পানিতে গোসল করতে পারেন। এতে ঘুম ভালো হবে।
  • শীতকালে টারমারিক ও জিঞ্জার সাপ্লিমেন্টের পরিবর্তে হলুদ পানি ও আদা চা খেতে পারেন।
  • খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
  • শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথা ও আর্থ্রাইটিসের ওষুধ সেবন করুন।

লেখক: পেইন মেডিসিন ও রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞ

ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিক), ঢাকা।

আরও