ওজন কমানোর জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেবে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা বিরতি দিয়ে উপবাস করার রীতি বেশ পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সাধারণ ডায়েটের চেয়ে আলাদা কোনো বিশেষ সুবিধা দেয় না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা সাধারণ ডায়েট—উভয় ক্ষেত্রেই মূলত ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমানোর ফলেই ওজন কমে।
কোচরান ডেটাবেজ অব সিস্টেমেটিক রিভিউস সাময়িকীতে গত সোমবার প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা নির্দিষ্ট সময় পর পর উপবাস করেন এবং যারা প্রতিদিন পরিমিত খাবার খান, তাদের ওজন কমার হারে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। ফলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যায়, তার পক্ষে জোরালো কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ‘কোচরান অ্যাসোসিয়েট সেন্টার’-এর প্রধান লেখক লুইস গ্যারেগনানি বলেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনেকের জন্য একটি ভালো বিকল্প হতে পারে, তবে বর্তমান তথ্য-প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উৎসাহকে সমর্থন করে না। এটি মূলত ওজন কমানোর প্রথাগত বা সাধারণ পদ্ধতির মতোই ফলাফল দেয়।
এই গবেষণার জন্য গবেষক দল উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় ২ হাজার স্থূলকায় মানুষের ওপর পরিচালিত ২২টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যালোচনা করেছেন। এই ট্রায়ালগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ফাস্টিং পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছিল। যেমন—সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে উপবাস করা, এক দিন স্বাভাবিক খাওয়া ও অন্য দিন খুব কম খাওয়া, অথবা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে খাবার গ্রহণ করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ ডায়েটের তুলনায় ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনুসরণকারীদের ওজন কমার হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে খুব বড় কোনো সাফল্য নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক কিথ ফ্রেন বলেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করলে বিপাক প্রক্রিয়ায় (মেটাবলিজম) কোনো জাদুকরী প্রভাব পড়ে—এমন দাবির পক্ষে গবেষণায় কোনো প্রমাণ মেলেনি। মূলত কম ক্যালরি গ্রহণের কারণেই ওজন কমে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্থূলতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন দশকে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতার হার দ্বিগুণ হয়েছে। স্থূলতা কমাতে অনেকেই এখন দামি ওষুধের ওপর নির্ভর করছেন, তবে সেই ওষুধ বন্ধ করে দিলে ওজন আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে টেকসই ও কার্যকর ডায়েট পদ্ধতি খুঁজে বের করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এখনো কার্যকর হতে পারে যদি কেউ নিজ ইচ্ছায় এবং অনুপ্রেরণা নিয়ে এটি অনুসরণ করেন। লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ পল গার্নার বলেন, গবেষণায় অংশ নেয়া ব্যক্তি আর বাস্তবে নিজের ইচ্ছায় ডায়েট করা ব্যক্তির মানসিকতায় পার্থক্য থাকে। তাই যারা নিয়মিত এটি পালন করতে পারেন, তারা সুবিধা পেতেও পারেন। তবে শেষ পর্যন্ত মূল বিষয়টি হলো শরীরে কতটুকু ক্যালরি ঢুকছে এবং কতটুকু খরচ হচ্ছে।
—ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে