বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া শিশুদের রোগ। গর্ভাবস্থায়ই শিশু এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। লিভারের রোগগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম মারাত্মক ব্যাধি। এ রোগের জটিলতাও খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণ জন্ডিসের লক্ষণের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রকাশ পায় এ রোগ। এ কারণে অনেক বাবা-মা শুরুতে বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া বুঝতে পারেন না। অনেকে অবহেলা করেন, এড়িয়ে যান। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে দ্রুত সুচিকিৎসা প্রদান করা যাবে।
বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া কী
লিভারে উৎপন্ন হওয়া পিত্তরস নালির মাধ্যমে পিত্তথলিতে জমা হয়। এগুলো শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে। খাবার হজমের পেছনেও পিত্তরসের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু কোনো কারণে পিত্তরস প্রবাহের নালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রস লিভারেই আটকে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগে শিশুর শরীরে জন্ডিসের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে জমে থাকা এ রসের কারণে লিভারে ক্ষত সৃষ্টি হয়। এতে লিভার সিরোসিস ও একপর্যায়ে লিভার অকার্যর হয়ে পড়ে।
কেন হয়
বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় শিশুর পিত্তনালি সঠিকভাবে বিকশিত না হলে এটি হতে পারে। আবার শিশুর নিজের শরীরের ইমিউন সিস্টেম দ্বারা পিত্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত ও অকার্যকর হয়ে পড়লে এ রোগের সৃষ্টি হয়। সাধারণত জন্মের পরপর ভাইরাল সংক্রমণের ফলে এমনটি হয়ে থাকে।
লক্ষণ ও উপসর্গ
জন্মের সময় এ রোগে আক্রান্ত শিশু সুস্থ ও স্বাভাবিক দেখায়। তবে সাধারণত প্রথম দুই মাসের মধ্যেই এর লক্ষণ-উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। যেমন:
এতে আক্রান্ত শিশুর ত্বক ও শরীরে হলদে ভাব দেখা যায়। অপরিণত লিভারের কারণে নবজাতকের জন্ডিস খুবই সাধারণ ঘটনা। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে তা সেরেও যায়। কিন্তু এর পরও যদি এ সমস্যা চলতেই থাকে তা হতে পারে বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া।
শিশুর প্রস্রাব গাঢ় রঙের হয়। রক্তে বৃদ্ধি পাওয়া বিলিরুবিনের কিছুটা কিডনির মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়।
সাদা, ধূসর ও কাদামাটি রঙের মল।
শিশুর ওজন দ্রুত হ্রাস পায়।
শিশু সারাক্ষণ অস্বস্তিবোধ করতে থাকে।
সম্ভাব্য জটিলতা
এ রোগের সঠিক চিকিৎসা না পেলে শিশুর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। মুখোমুখি হতে হয় আরো নানাবিধ জটিলতার। শিশুর যেসব সমস্যা দেখা যেতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে—
লিভারে ক্ষত বা সিরোসিস হতে পারে।
রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
পেট ফোলা ভাব। তরল জমা হয়ে শিশুর পেট ফুলে যায়।
লিভারের আকার বড় হয়ে যায়।
খাদ্যনালির আস্তরণে শিরা ফুলে রক্তপাত হতে পারে। এটি প্রাণঘাতী জটিলতা।
এগুলো শিশুর লিভার ফেইলিউরের কারণ হতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা হলে এসব ঝুঁকি কমিয়ে আনা যায়।
কখন শিশুকে হাসপাতালে নেবেন
শিশুর জন্মের দুই সপ্তাহের মধ্যে সাধারণ জন্ডিস ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এর পরও জন্ডিস থাকলে এবং মলের রঙ ফ্যাকাশে হওয়া বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়ার লক্ষণ। এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করা শিশুর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে হাসপাতালে নিন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণের পর বাসায় ফিরে আরো বেশি সতর্ক থাকুন। চিকিৎসা-পরবর্তী সময়ে পুনরায় শিশুর জন্ডিস, ফ্যাকাশে রঙের মল ও গাঢ় প্রস্রাব দেখলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রোগ নির্ণয়
জন্ডিসের লক্ষণ লিভারের অন্য কোনো জটিলতার ফলেও দেখা দিতে পারে। তাই বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া নিশ্চিত হতে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া নির্ণয়ে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
পেটের আল্ট্রাসাউন্ড করে পিত্তথলি দেখা হয়। অস্বাভাবিক পিত্তথলি কিংবা পিত্তথলির অনুপস্থিতি বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়াকে নিশ্চিত করে।
লিভার বায়োপসি করেও বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়া নির্ণয় করা যায়।
অপারেটিভ কোল্যানজিওগ্রাম নামের এক্স-রে পরীক্ষার মাধ্যমেও এ রোগ শনাক্ত করা যায়।
চিকিৎসা
ওষুধের মাধ্যমে বিলিয়ারি অ্যাট্রেসিয়ার চিকিৎসায় কোনো লাভ হয় না। এর জন্য সার্জারি উপযুক্ত সমাধান। জটিল পর্যায়ে এ রোগের চিকিৎসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করা হলে কাসাই প্রসিডিউর (Kasai Procedure) বা হেপাটোপোর্টোএন্টারেস্টোমি পদ্ধতিতে সফলতা পাওয়া যায়। এ পদ্ধতিতে প্রথমত, লিভারের বাইরের ক্ষতিগ্রস্ত নালিগুলো অপসারণ করা হয়। এরপর পিত্তরস সরবরাহে সক্ষম নালি খুঁজে বের করে তা দ্বারা লিভার ও অন্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়। এক্ষেত্রে সার্জারির পর প্রায় ৭-১০ দিন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন হতে পারে।
এ ধরনের সার্জারির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে শিশুর বয়স ও লিভারের ক্ষত বা সিরোসিসের মাত্রার ওপর।
লেখক: নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ
ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান