এটি মূলত প্যারামিক্সোভাইরিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত মরবিলিভাইরাস গণের একটি বিশেষ সদস্য, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে মিজেলস ভাইরাস নামে পরিচিত। সামান্য হাঁচি-কাশি কিংবা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ রোগ সঠিক সময়ে শনাক্ত করা না গেলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হলে হাম প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। তবে সঠিক সময়ে টিকাদান এবং সচেতনতাই পারে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে।
রোগতত্ত্ব
হামের ভাইরাস তাপ প্রতিরোধী এবং স্বল্প আর্দ্রতায় বেশি মাত্রায় বাঁচে। এটি খুবই ছোঁয়াচে রোগ। হাঁচি, কাশির মাধ্যমে মুহূর্তেই হামের ভাইরাস শ্বাসনালির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। চোখের কনজাংটিভারের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। উপরিস্থিত শ্বাসনালির শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে ভাইরাসটি প্রবেশ করে এবং বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। চার-ছয়দিন পর ভাইরাসটিকে যকৃৎ ও প্লীহার রেটিকুলো এন্ডোথেলিয়াল কোষের মধ্যে দেখা যায়। এ অবস্থা লসিকা নালি ও রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ঘটে থাকে। এখানেও ভাইরাসের বৃদ্ধি ঘটে। হাম সাধারণত শ্বাসনালির মৃদু ও আরোগ্যযোগ্য প্রদাহের সৃষ্টি করে। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধ্বাংসাত্মক ব্রংকিওলাইটিস অথবা জায়ান্ট সেল নিউমোনিয়াও দেখা দিতে পারে।
লক্ষণ ও উপসর্গ
- তীব্র জ্বর
- সর্দি
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া
- চোখ দিয়ে পানি পড়া
- খাবারে অরুচি
- শরীরে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়া এবং দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া।
- জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানপাকা, কর্নিয়ার ক্ষত, নাকে-মুখে ঘা, অপুষ্টি, সেপটিসেমিয়া ও মস্তিষ্কের প্রদাহ দেখা দিতে পারে।
রোগ নির্ণয়
কোনো রোগীর সংস্পর্শে আসার ইতিহাস থাকলে রোগের উপস্থিতি সম্বন্ধে সন্দেহ করা উচিত। মুখের ভেতর কপলিক স্পটের উপস্থিতি রোগ নির্ণয়ে সহায়ক। বয়স্কদের ক্ষেত্রে ফুসকুড়ির রঙ বেগুনি এবং অনেক বেশি বিস্তৃত হতে পারে। ল্যাবরেটরিতে ভাইরাস আলাদাকরণের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা যেতে পারে। এছাড়া হেমাগ্লুটিনেশন ইনহিবিশন এবং এনজাইম-লিঙ্কড ইমিউনোসরবেন্ট অ্যাস নামক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।
চিকিৎসা
হামের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। জটিলতা না থাকলে বিশ্রামই মূল চিকিৎসা। মাথাব্যথা এবং মাংসপেশির ব্যথায় চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। প্রচুর তরল খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পান যথেষ্ট উপকারী। আলোকভীতি থাকলে ঘর অন্ধকার রাখা প্রয়োজন। কান ও ফুসফুসের সংক্রমণ হলে কোট্রাইমক্সাজল কার্যকর। নিউমোনিয়া হলে পেনিসিলিন ও অ্যামাইনো গ্লাইকোসাইড প্রয়োজন হতে পারে। স্ট্যাফাইলোকক্কাস নিউমোনিয়া হলে ফুক্লক্সাসিলিন দিতে হবে। ভীষণভাবে অসুস্থ রোগীকে অ্যান্টিভাইরাস ওষুধ দেয়া যেতে পারে। অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ এড়াতে আক্রান্ত ব্যক্তি বা শিশুকে র্যাশ মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আলাদা রাখতে হবে। অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে রোগীকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রাখতে হবে।
হামের টিকা
টিকা দিয়ে যে কয়টি মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব, হাম তাদের অন্যতম। যথা সময়ে হামের টিকা নিলে সহজেই রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুবার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেয়া হয়। একবার নয় মাস বয়সে আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সময়মতো টিকা দিয়ে এ রোগের হাত থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিসিন বিভাগ, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল