হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

সম্প্রতি চীনসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাসের (এইচএমপিভি) প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

সম্প্রতি চীনসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাসের (এইচএমপিভি) প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সর্বশেষ তথ্য জানাচ্ছে, চলতি বছর প্রথমবারের মতো দেশে এক ব্যক্তির শরীরে এইচএমপিভি শনাক্ত হয়েছে। তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাংলাদেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো অতি জরুরি।

হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস বা এইচএমপিভি কী?

হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস হলো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণকারী একটি রোগ, যা নিউমোভিরিডি পরিবারের মেটানিউমোভাইরাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি একটি আরএনএ (রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) ভাইরাস। ভাইরাসটি ডাচ গবেষক বার্নাডেট জি ভ্যান ডেন হুগেন ও তার দল প্রথম শনাক্ত করেন ২০০১ সালে।

কীভাবে ছড়ায়?

সাধারণ সর্দি, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসকষ্টজনিত ভাইরাসের মতো এইচএমপিভিও মূলত সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে অন্যদের মধ্যে ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শ এবং একই থালায় খাবার খাওয়ার মাধ্যমেও এটি সুস্থ ব্যক্তির দেহে সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির শ্লেষ্মা লেগে থাকা স্থান যেমন ফোন, দরজার হাতল, লিফটের বাটন, কী-বোর্ড, চায়ের কাপ বা অন্যান্য জিনিসপত্র হাত দিয়ে স্পর্শ করার পর সে হাত চোখে, নাকে বা মুখে ছোঁয়ালে এইচএমপিভি ছড়াতে পারে।

লক্ষণ ও উপসর্গ

সাধারণ সর্দির মতো এটিও ঊর্ধ্ব ও নিম্ন শ্বাসনালিতে সংক্রমণ সৃষ্টি করে। ফলে নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কিওলাইটিসের মতো জীবননাশক পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হতে পারে। এইচএমপিভি সংক্রমণের ফলে শরীরে নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়—

  • সর্দি-কাশি
  • জ্বর
  • মাথাব্যথা
  • নাসারন্ধ্র বন্ধ
  • শ্বাসকষ্ট
  • কখনো কখনো ত্বকে র‌্যাশ দেখা যেতে পারে

ভাইরাসটি সংক্রমণের তিন-ছয়দিনের মধ্যে শরীরে এর লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করে, যা সাধারণত ৭-১০ দিনের মধ্যে কমেও পায়। নিউমোনিয়া কিংবা অন্যান্য সেকেন্ডারি রোগের ক্ষেত্রে আরোগ্য লাভের প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘায়িত হয়। এইচএমপিভির লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখুন। এরপর যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসুন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে সুচিকিৎসা গ্রহণ করুন।

কারা আছেন ঝুঁকিতে?

  • ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু
  • ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি
  • যারা হাঁপানি কিংবা ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজে ভুগছেন
  • গর্ভবতী নারী
  • যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম।

সংক্রমণ প্রতিরোধে করণীয়

  • হাঁচি ও কাশির সময় বাহু কিংবা টিস্যু দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন। ব্যবহৃত টিস্যু নির্দিষ্ট ময়লার ঝুড়িতে ফেলুন।
  • আক্রান্ত হয়েছে এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন এবং কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। প্রয়োজনে মাস্ক পরিধান করুন।
  • ঘনঘন অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান কিংবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না।
  • জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অন্যদের থেকে আলাদা থাকুন। প্রয়োজনে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।

লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট, মেডিসিন বিভাগ

ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল

আরও