হার্ভাড ইউনিভার্সিটির গবেষণা

নিয়মিত চা-কফি পানে কমতে পারে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি

সম্প্রতি ‘জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ (জেএএমএ) এ প্রকাশিত এই গবেষণায় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের গত ৪০ বছরের স্বাস্থ্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিদিন কয়েক কাপ চা বা কফি পান করা কেবল শরীরকে চনমনেই রাখে না, বরং এটি বার্ধক্যের অন্যতম রোগ ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন অটুট থাকে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

সম্প্রতি ‘জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ (জেএএমএ) এ প্রকাশিত এই গবেষণায় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের গত ৪০ বছরের স্বাস্থ্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ক্যাফেইনযুক্ত চা বা কফি পান করেন, তাদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি যারা একেবারেই পান করেন না তাদের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন দুই থেকে তিন কাপ ক্যাফেইনযুক্ত কফি অথবা এক থেকে দুই কাপ ক্যাফেইনযুক্ত চা পান করেন, তারা সবচেয়ে বেশি উপকার পান। এই ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা পরীক্ষার ফলাফল অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো এবং তাদের স্মৃতিশক্তি হ্রাসের হারও বেশ ধীর বলে গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন।

গবেষণার প্রধান লেখক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিসংক্রান্ত মহামারি বিশেষজ্ঞ ইউ ঝাং বলেন, চা ও কফির সঙ্গে মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের এই যোগসূত্র অত্যন্ত জোরালো। তবে তিনি এও সতর্ক করেছেন, এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণ করে না যে কেবল চা বা কফি পানই ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে। কারণ যারা নিয়মিত চা-কফি পান করেন, তাদের অন্যান্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্যাফেইন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যেভাবে কাজ করে

বিজ্ঞানীদের মতে, চা ও কফিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যাফেইন ও পলিফেনল থাকে। এই উপাদানগুলো মস্তিষ্কের রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এগুলো মস্তিষ্কের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে থাকে।

ক্যাফেইন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক। যেহেতু ডায়াবেটিস ডিমেনশিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ, তাই পরোক্ষভাবে চা বা কফি পান করা মস্তিষ্কের সুরক্ষায় কাজ করে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, ডিক্যাফিনেটেড বা ক্যাফেইনমুক্ত কফির ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা লক্ষ্য করা যায়নি। এর অর্থ হলো, মস্তিষ্কের যত্নে ক্যাফেইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গবেষণার ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ

হার্ভার্ডের গবেষক দল যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় জনস্বাস্থ্য গবেষণার তথ্য দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অংশগ্রহণকারীরা নিয়মিত তাদের খাদ্যতালিকা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের তথ্য প্রদান করেছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা সবচেয়ে বেশি ক্যাফেইনযুক্ত কফি পান করেন, তাদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি গড়ে ১৮ শতাংশ কম। তবে এই সুফল পাওয়ার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। দিনে দুই থেকে তিন কাপ কফি পানের পর এর ইতিবাচক প্রভাব আর খুব একটা বাড়তে দেখা যায়নি। অর্থাৎ অতিরিক্ত পানের চেয়ে পরিমিত পান করাই বেশি কার্যকর।

বিশেষজ্ঞদের মত ও জীবনযাত্রা

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির কার্ডিওমেটাবলিক মেডিসিনের অধ্যাপক নাভিদ সাত্তার বলেন, ক্যাফেইনের কিছু ভালো ও খারাপ উভয় দিকই থাকতে পারে। চা বা কফিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের জন্য উপকারী এবং এটি মানুষকে কাজ করতে বা ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্যাফেইন রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা আবার ডিমেনশিয়ার অন্যতম কারণ।

গবেষক ইউ ঝাং পরামর্শ দিয়েছেন, চা বা কফিকে কোনো ‘যাদুর কবজ’ মনে করা ঠিক হবে না। সারা বিশ্বে ডিমেনশিয়ার প্রায় অর্ধেক সমস্যাই স্থূলতা, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে জড়িত। তাই কেবল পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। চা বা কফি পান করাকে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে।

আরও