যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা

মহামারিতে স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন, বেড়েছে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর প্রাণহানি

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি গতকাল চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জ্যামা অনকোলজি’ তে প্রকাশিত হয়েছে।

করোনা মহামারির শুরুর বছরগুলোতে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন, ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটলে অনেক মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, তাদের সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। খবর এপি।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি গতকাল চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘জ্যামা অনকোলজি’ তে প্রকাশিত হয়েছে।

মহামারিকালীন স্বাস্থ্যসেবার অচলাবস্থা কীভাবে ক্যানসার রোগীদের স্বল্পমেয়াদী বেঁচে থাকার ওপর প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে এটিই প্রথম কোনো বিস্তারিত গবেষণা। গবেষকরা জানিয়েছেন, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ ও ২০২১ সালে ক্যানসার শনাক্ত হওয়া রোগীদের এক বছর বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

স্বল্পমেয়াদে বেঁচে থাকার হার হ্রাস

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ ও ২০২১ সালে ক্যানসার শনাক্ত হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এক বছরের বেঁচে থাকার হার আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশ কম। এই চিত্র সব ধরনের ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রেই দেখা গেছে— সেটি শুরুর দিকে ধরা পড়ুক বা একদম শেষ পর্যায়ে।

সাধারণত ক্যানসার রোগীদের জন্য করোনা সংক্রমণ এমনিতেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এই গবেষণায় গবেষকরা কেবল সেই সব মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন, যা সরাসরি করোনায় হয়নি। তারা দেখতে চেয়েছেন, করোনা ছাড়া অন্য কোনো কারণ ক্যানসার রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়েছিল কি না।

স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্নই মূল কারণ

গবেষণাটির প্রধান লেখক কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ টড বুরুস জানান, ঠিক কোন কারণে বেঁচে থাকার হার কমেছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে তার মতে, মহামারির সময়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অচলাবস্থা একটি বড় কারণ হতে পারে।

করোনার প্রকোপে ২০২০ সালে বিশ্বের অধিকাংশ হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো রোগীতে উপচে পড়ছিল। এই সংকটের কারণে ক্যানসার শনাক্তের নিয়মিত পরীক্ষাগুলো, যেমন— কোলনোস্কপি, ম্যামোগ্রাম ও ফুসফুসের স্ক্যান করাতে দেরি করেছিলেন অনেক রোগী। এর ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়নি। টড বুরুস বলেন, ‘আমরা চিকিৎসা পদ্ধতি ভুলে যাইনি, কিন্তু মহামারির কারণে রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ ও গতি কমে গিয়েছিল।’

কিছু নির্দিষ্ট ক্যানসারে ঝুঁকি বেশি

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে কোলোরেক্টাল (বৃহদান্ত্র), প্রোস্টেট ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার বেশি ছিল। গবেষকদের তথ্যমতে, ২০২০ ও ২০২১ সালে প্রায় ১০ লাখ মানুষের ক্যানসার শনাক্ত হয়েছিল, যাদের মধ্যে এক লাখ ৪৪ হাজার মানুষ এক বছরের মধ্যেই মারা গেছে। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, মহামারির বিঘ্ন না ঘটলে এই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ১৭ হাজার ৪০০ জন কম হতে পারতো।

ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির মহামারি বিশেষজ্ঞ হিউনা সাং বলেন, চিকিৎসার এই সাময়িক সংকট দীর্ঘমেয়াদী মৃত্যুহারে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে যেকোনো বৈশ্বিক মহামারিতে স্বাস্থ্যসেবা ঠিক রাখতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবে।

উত্তর আমেরিকার সেন্ট্রাল ক্যানসার রেজিস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের গবেষক রেসিন্ডা শেরম্যান এই গবেষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, করোনার প্রভাব সম্পর্কে আমরা যত বেশি জানব, পরবর্তী যেকোনো সংকট মোকাবিলায় আমরা তত বেশি প্রস্তুত থাকতে পারব।

আরও