গর্ভাবস্থায় সঠিক যত্ন

মা ও শিশুর সুস্থতার প্রথম শর্ত

গর্ভাবস্থায় সঠিক যত্ন অনেক সময় জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

কারণ এ সময় হঠাৎ করেই নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা মা ও গর্ভের শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। একটি সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য, নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে সচেতনতা এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক প্রস্তুতি। এসব বিষয় শুধু গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি কমায় না, বরং মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জন্মের আগে ও পরে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ মা এবং নবজাতকের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

গর্ভাবস্থার যত্ন কী?

গর্ভাবস্থার যত্ন বলতে গর্ভবতী নারীর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরামর্শকে বোঝায়। অনেক নারী গর্ভধারণের আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করেন। গর্ভাবস্থার সময় নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে শিশুর বৃদ্ধি, মায়ের শারীরিক অবস্থা এবং সম্ভাব্য জটিলতা শুরুতেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মা প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন না, তাদের ক্ষেত্রে কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

গর্ভাবস্থার যত্নের ধরন

প্রসবপূর্ব যত্ন: গর্ভাবস্থার পুরো সময় মা ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং এবং আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হয়।

প্রসবোত্তর যত্ন: সন্তান জন্মের পর মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ, নবজাতকের পরিচর্যা এবং প্রসব-পরবর্তী জটিলতা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়।

গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা

গর্ভাবস্থায় কিছু নিয়মিত পরীক্ষা মা ও শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে—

 রক্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ ও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়।

 প্রস্রাব পরীক্ষা, যাতে সংক্রমণ বা কিডনি-সংক্রান্ত সমস্যা শনাক্ত করা যায়।

 আল্ট্রাসাউন্ড, যা ভ্রূণের বৃদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে।

 গর্ভকালীন ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং।

 মায়ের বয়স, পারিবারিক রোগের ইতিহাস বা বিশেষ ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী জেনেটিক পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

গর্ভাবস্থার সাধারণ ঝুঁকি ও জটিলতা

প্রায় ৮ শতাংশ গর্ভাবস্থায় বিশেষ চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। সাধারণ জটিলতার মধ্যে রয়েছে—

 গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করে।

 প্রি-এক্লাম্পসিয়া, অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা।

 রক্তস্বল্পতা, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 বিভিন্ন সংক্রমণ, যা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এসব সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে সাহায্য করে। উচ্চ ঝুঁকির গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরো ঘন ঘন পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।

সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য করণীয়

গর্ভধারণের আগে থেকেই সুস্থ জীবনযাপন শুরু করা সবচেয়ে ভালো। দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ওজন স্বাভাবিক রাখা এবং ধূমপান বা অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করলে গর্ভকালীন জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

এছাড়া গর্ভাবস্থায় কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া উচিত—

 চিকিৎসকের নির্ধারিত সব প্রসবপূর্ব চেকআপ, আল্ট্রাসাউন্ড ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

 শরীরে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

 গর্ভধারণের পরিকল্পনার সময় থেকেই প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করুন। এটি শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সহায়ক।

 চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডি, আয়রন ও ক্যালসিয়াম গ্রহণ করুন।

 পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।

 নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার বা গর্ভবতীদের জন্য উপযোগী ব্যায়াম করুন।

 ধূমপান, অ্যালকোহল এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ করবেন না।

 কাঁচা বা অর্ধসেদ্ধ মাংস, অপাস্তুরিত দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক খাবার এড়িয়ে চলুন।

সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় হুপিং কাশি (পারটুসিস) ও মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেয়া মা ও নবজাতক উভয়ের জন্যই উপকারী।

সঠিক সময়ে সঠিক যত্ন, নিয়মিত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন একটি নিরাপদ গর্ভাবস্থা ও সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

আরও