বাড়ছে আয়রনের ঘাটতিজনিত সমস্যা, প্রতিকারে করণীয়

একজন মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে কয়টি মৌলিক পুষ্টি উপাদান অপরিহার্য, তার মধ্যে আয়রন বা লৌহ অন্যতম।

এটি কেবল রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রধান উপাদানই নয়, বরং শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বও পালন করে এ খনিজ। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে পুষ্টিহীনতার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো আয়রনের অভাব। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নারীদের শারীরিক দুর্বলতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং শিশুদের মেধার বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ ঘাটতি।

আয়রনের ঘাটতি কেন হয়?

শরীরে আয়রনের ঘাটতি বা আয়রন ডেফিসিয়েন্সি মূলত দুটি কারণে ঘটে তা হলো—শরীরে আয়রনের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকা কিংবা শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়া। খাদ্যতালিকায় নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার না রাখা, গর্ভাবস্থায় আয়রনের বাড়তি চাহিদা পূরণ করতে না পারা এবং বিশেষ করে নারীদের পিরিয়ডকালীন রক্তক্ষরণ এর প্রধান কারণ। এছাড়া পাকস্থলী বা অন্ত্রের কোনো সমস্যার কারণেও অনেক সময় শরীর খাবার থেকে পর্যাপ্ত আয়রন শোষণ করতে পারে না।

আয়রনের অভাবজনিত উপসর্গ

শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে তা প্রাথমিক পর্যায়ে বোঝা না গেলেও ধীরে ধীরে লক্ষণগুলো প্রকট হতে থাকে। আয়রনের অভাবে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে যে প্রধান সমস্যাগুলো দেখা দেয় তা হলো—

তীব্র ক্লান্তি ও অবসাদ: পর্যাপ্ত ঘুমের পরও সারাক্ষণ দুর্বল অনুভব করা এবং অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা আয়রনের অভাবের প্রধান লক্ষণ।

মনোযোগের অভাব: মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব ঘটে বলে কোনো কাজে ঠিকমতো মনোযোগ দেয়া যায় না, মাথা ঘোরা এবং প্রায়ই মাথাব্যথার সমস্যা দেখা দেয়।

ত্বকের ফ্যাকাশে ভাব: চোখের নিচে, নখ বা জিহ্বা সাদাটে বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার স্পষ্ট সংকেত।

চুল পড়া ও ভঙ্গুর নখ: আয়রনের অভাবে কোষের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে মাত্রাতিরিক্ত চুল পড়া এবং নখ খসখসে হয়ে ফেটে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়।

অস্বাভাবিক রুচি (পিকা): অনেক সময় আয়রনের ঘাটতি থাকলে অখাদ্য কুখাদ্য যেমন—মাটি, কয়লা বা বরফ খাওয়ার প্রতি এক ধরনের তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়।

অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা

আয়রনের ঘাটতি যখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তাকে বলা হয় ‘আয়রন ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া’। বিশেষ করে কিশোরী ও গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। রক্তস্বল্পতার কারণে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে, কারণ অল্প রক্ত দিয়ে পুরো শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হৃৎপিণ্ডকে তখন দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকিও থেকে যায়।

প্রতিকার

আয়রনের ঘাটতি দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সঠিক খাদ্যাভ্যাস। আয়রন প্রধানত দুটি উৎস থেকে পাওয়া যায়—

প্রাণিজ উৎস: গরুর কলিজা, খাসির মাংস, সামুদ্রিক মাছ এবং ডিমে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। এ আয়রন শরীর খুব দ্রুত শুষে নিতে পারে।

উদ্ভিজ্জ উৎস: সবুজ শাকসবজি বিশেষ করে কচুশাক ও পালং শাক, বিট, ডালিম, আঙুর, খেজুর এবং বাদাম আয়রনের চমৎকার উৎস।

শুধু আয়রনযুক্ত খাবার খেলেই হবে না, শরীরে তার শোষণ নিশ্চিত করতে হবে। আয়রন শোষণের জন্য ভিটামিন-সি অপরিহার্য। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি লেবু, আমলকী বা মাল্টার মতো টক জাতীয় ফল খাওয়া উচিত। অন্যদিকে খাবার খাওয়ার ১ ঘণ্টা আগে বা পরে চা-কফি পানের অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। কারণ চা-কফিতে থাকা ট্যানিন ও ক্যাফেইন আয়রন শোষণে সরাসরি বাধা দেয়।

লেখক: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান

আরও