স্ট্রোক বা ব্রেন স্ট্রোক একই। স্ট্রোক মস্তিষ্কে হয় বলে একে ব্রেইন স্ট্রোকও বলা হয়। অনেকেই স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাককে এক মনে করেন, যা সঠিক নয়। স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতার কারণে হয়ে থাকে। ইঞ্জিন চালানোর জন্য যেমন জ্বালানি লাগে, ঠিক তেমনি আমাদের শরীর সচল রাখতে মস্তিষ্কের নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। মস্তিষ্কের লাখ লাখ ধমনির রক্তপ্রবাহ থেকে মস্তিষ্ক এ অক্সিজেন পেয়ে থাকে। কোনো কারণে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ এসব রক্তনালিগুলো সংকীর্ণ হলে বা ছিঁড়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের কোষ নিস্তেজ বা নষ্ট হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেই স্ট্রোক বলে। আমাদের দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৭৩ জন এ রোগে মারা যায়।
প্রকারভেদ
ইস্কেমিক স্ট্রোক: এটি সবচেয়ে সাধারণ স্ট্রোক। প্রায় ৮৫ ভাগ রোগী এ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। মস্তিষ্কের ধমনিতে চর্বি জমে অথবা রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ইস্কেমিক স্ট্রোক হয়ে থাকে।
হেমোরেজিক স্ট্রোক: হেমোরেজিক স্ট্রোকে ব্রেনের দুর্বল রক্তনালি ছিঁড়ে বা ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তপাত হয়। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। এ ধরনের স্ট্রোকগুলো ইস্কেমিক স্ট্রোকের চেয়ে বেশি মারাত্মক হয়।
এছাড়া ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক স্ট্রোক বা ওয়ার্নিং স্ট্রোক নামে আরো এক ধরনের স্ট্রোক রয়েছে। এতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সাময়িকভাবে (কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার জন্য) বন্ধ হয় এবং লক্ষণগুলো নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। যথাযথ চিকিৎসা না নিলে এদের প্রতি ১০ জনে একজন তিন মাসের মধ্যে মেজর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়।
কারণ
বিভিন্ন কারণে স্ট্রোক হতে পারে। তবে এর মধ্যে হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ অন্যতম। তাই শুধু রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই স্ট্রোকের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব। এছাড়া স্ট্রোকের অন্যান্য কারণ হলো-
ডায়াবেটিস
রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, হতাশা
কায়িক শ্রম না করা
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস। ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার খাওয়া
ওজন বেড়ে যাওয়া
ধূমপান ও মাদকাসক্তি
হার্টের সমস্যা
এছাড়া পারিবারিক ইতিহাস ও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
ব্রেন স্ট্রোক রোগীদের জন্য গোল্ডেন আওয়ার
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেয়ার পর প্রথম ১ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা সময় রোগীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোকের রোগীদের জন্য এ সময় Time is Brain অর্থাৎ প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ এ সময়ের মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে থ্রম্বোলাইসিস (মস্তিষ্কের জমাট বাঁধা রক্ত গলানোর চিকিৎসার মাধ্যমে রক্ত চলাচল সচল করা) শুরু করা গেলে প্রায় ৪০-৫০ ভাগ রোগী সম্পূর্ণ বা উল্লেখযোগ্যভাবে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই এ সময়কে গোল্ডেন আওয়ার বলা হয়।
স্ট্রোক হলে কী করবেন
কোনো রোগীর ওপরের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে তার স্ট্রোক হয়েছে। এ সময় আতঙ্কিত না হয়ে জরুরি ভিত্তিতে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। স্ট্রোকের চিকিৎসা অনেকাংশেই এর ধরনের ওপর নির্ভর করে। যেমন ইস্কেমিক স্ট্রোকে সাধারণত যে চিকিৎসা দেয়া হয় হেমোরেজিক স্ট্রোকে তা কার্যকর নয়। হেমোরেজিক স্ট্রোকে অনেক সময় অপারেশনের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসক সাধারণত স্ট্রোকের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
লক্ষণ
স্ট্রোকের লক্ষণগুলো হলো—
হঠাৎ হাত-পা বা শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ অবশ হয়ে আসা
এক বা উভয় চোখে ঝাপসা দেখা। কখনো কখনো ডাবল ভিশন হওয়া
মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া
জিহ্বা অসাড় হয়ে আসা বা কথা জড়িয়ে যাওয়া
হাত-পা বা শরীরের কোনো একদিক হঠাৎ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া
হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং খিঁচুনি
হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারান
প্রতিরোধে করণীয়
স্ট্রোক মানেই ব্রেনের মারাত্মক ক্ষতি। তাই স্ট্রোক থেকে বাঁচতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা। প্রতিরোধে যা যা করবেন—
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ
নিয়মিত ৩০-৪০ মিনিট শরীরচর্চা বা হাঁটার অভ্যাস
বিএমআই অনুসারে ওজন নিয়ন্ত্রণ
পর্যাপ্ত ঘুম
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ মুক্ত থাকা। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন
নিয়মিত ব্লাড প্রেশার চেক করুন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন। সঠিক চিকিৎসা নিন, সুস্থ থাকুন।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
ইন-চার্জ, ল্যাবএইড স্ট্রোক সেন্টার, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক