সহিংস পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে না

আমার প্রথম কথা হবে, সহিংসতাকে স্বাভাবিক বা নিজের ভাগ্য বলে মেনে নেবেন না। প্রথমে নিজের এবং সন্তানের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিন। পরিস্থিতি বিপজ্জনক হলে একা মুখোমুখি সংঘাতে না গিয়ে বিশ্বস্ত আত্মীয়, বন্ধু বা নিরাপদ ব্যক্তির সহায়তা নিন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা, আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সাহায্য নিন।

শিশুর কাছে পরিবারই পৃথিবীর প্রথম নিরাপদ আশ্রয়। ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্পর্ক কিংবা মতবিরোধ সামলানোর ভাষা—জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ পাঠ সে প্রথম শেখে পরিবার থেকেই। কিন্তু সেই পরিবারেই যখন প্রতিদিনের ঝগড়া, গালাগালি, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন শিশুর ভেতর থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় নিরাপত্তাবোধ। তাকে সরাসরি আঘাত না করা হলেও বাবা-মায়ের সংঘাত, চিৎকার কিংবা সহিংসতার প্রতিটি দৃশ্য তার মনে তৈরি করতে পারে গভীর ক্ষত। যে ঘরটিকে নিরাপদ ভাবার কথা, সেটিই যখন অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তখন শিশুর কাছে শুধু পরিবার নয়, পুরো পৃথিবীটাই হয়ে উঠতে পারে অনিশ্চিত ও ভয়ংকর।

পারিবারিক সহিংসতা, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিশুর মানসিক অবস্থা ও পরবর্তী জীবনের নানাদিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামীমা ইসলাম।

দেশে পারিবারিক সহিংসতা ও শিশুদের ট্রমার শিকার হওয়ার বর্তমান প্রবণতা বা হার কেমন?

বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা এখনো একটি বড় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ২০২৪ সালের জাতীয় ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট ওমেন সার্ভে’ অনুযায়ী, প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ধরলে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং গত ১২ মাসে ৪৯ শতাংশ নারী এমন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। মানসিক বা আবেগীয় নির্যাতন এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও এর মধ্যে বড় অংশ।

শিশুদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১-১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর প্রায় ৯ জন প্রতি মাসে বাড়িতে শারীরিক শাস্তির শিকার হয়; এর পাশাপাশি মানসিক আক্রমণও এর মধ্যে রয়েছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সহিংসতার শিকার হওয়া আর পিটিএসডি বা গভীর ট্রমা তৈরি হওয়া এক কথা নয়। প্রত্যেক শিশু একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও পারিবারিক অশান্তি শিশুর মনস্তত্ত্বে কীভাবে দাগ কাটে?

শুধু মারধরের কারণেই শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বাবা-মায়ের নিয়মিত ঝগড়া, গালাগালি, অপমান, ভয় দেখানো, বিচ্ছেদের হুমকি কিংবা একজনের ওপর আরেকজনের সহিংসতা দেখাও শিশুর জন্য গভীর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। একে বলা হয় টক্সিক পরিবেশ কিংবা ডিসরাপটিভ ফ্যামিলি।

শিশুর মনে তখন নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়ে যায়। তার আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে না বা গড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। আত্মবিশ্বাসহীন শিশু ভাবতে শুরু করে, ‘আমার পরিবার আমার জন্য নিরাপদ নয়, কাল কী হবে কে জানে?’

দীর্ঘদিনের এ অনিরাপত্তাবোধ শিশুর ঘুম, মনোযোগ, পড়াশোনা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সহিংসতার অভিজ্ঞতা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ, শিক্ষা এবং পরবর্তী সামাজিক ও পেশাগত জীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রমায় আক্রান্ত শিশুর আচরণজনিত প্রধান লক্ষণ কী কী?

বয়সভেদে লক্ষণ আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণভাবে হঠাৎ খুব চুপচাপ হয়ে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক রাগী হয়ে ওঠা, আগে যে কাজে আনন্দ পেত তাতে আগ্রহ হারানো, ঘুমের সমস্যা বা দুঃস্বপ্ন, অতিরিক্ত ভয়, বাবা-মাকে ছেড়ে থাকতে না চাওয়া—এসব পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। স্কুলে মনোযোগ কমে যেতে পারে, ফল খারাপ হতে পারে। কেউ বন্ধুদের এড়িয়ে চলতে পারে, কেউ আবার অস্বাভাবিক আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে আচরণে আগের বয়সের মতো কিছু পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। এমনকি কেউ কেউ নিজের ওপরই দোষ চাপাতে শুরু করে—ভাবতে পারে, ‘আমার জন্যই বাবা-মা ঝগড়া করেন।’

তবে একটি লক্ষণ দেখেই শিশুর ট্রমা হয়েছে বলে ধরে নেয়া ঠিক নয়। আচরণের পরিবর্তন কতদিন ধরে আছে এবং তা শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কতটা ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শৈশবের ট্রমা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্যারিয়ার ও সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলে?

শৈশবের দীর্ঘস্থায়ী ভয় ও অনিরাপত্তার প্রভাব শুধু সেই বয়সেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বড় হওয়ার পর আত্মবিশ্বাস, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত নেয়া, মনোযোগ এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। কেউ অতিরিক্ত আত্মসন্দেহে ভুগতে পারেন, কেউ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে সম্পর্ক আঁকড়ে ধরতে পারেন। আবার কারো মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এড়িয়ে চলার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

কর্মজীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, কাজের চাপ সামলাতে অসুবিধা, ব্যর্থতার অতিরিক্ত ভয় কিংবা কর্মক্ষেত্রে সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে শৈশবের ট্রমা মানেই ভবিষ্যৎ জীবন ব্যর্থ হবে—এমন নয়। যথাযথ সহায়তা ও চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষ সুস্থ ও সফল জীবনযাপন করতে পারেন।

শৈশবের ট্রমা থেকে বড় হয়ে নিজের মধ্যেও কি সহিংস আচরণের প্রবণতা বাড়ে?

শৈশবে সহিংসতা দেখা বা নির্যাতনের শিকার হওয়া ভবিষ্যতে নিজে সহিংস হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারণ পরিবার থেকেই শিশু শেখে রাগ কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, মতবিরোধ কীভাবে মেটাতে হয় এবং অন্যকে কীভাবে সম্মান করতে হয়। যদি সে বারবার দেখে যে সমস্যার সমাধান মারধর, অপমান কিংবা ভয় দেখানো, তাহলে বড় হয়ে সেই আচরণকে স্বাভাবিক মনে করার ঝুঁকি থাকে। তবে এটিও কোনো অনিবার্য পরিণতি নয়।

ভুক্তভোগীরা কি এখন নিজে থেকে কাউন্সেলিং বা থেরাপি নিতে আসছেন?

সচেতনতা আগের তুলনায় বাড়ছে। মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে মানসিক কষ্টও চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা, শুধু ‘সহ্য করে যেতে হবে’—এমন নয়। তবে এখনো বড় বাধা হলো সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং ‘সংসারের কথা বাইরে বলা যাবে না’—এই লুকোচাপার সংস্কৃতি। ২০২৪ সালের জাতীয় জরিপেও দেখা গেছে, স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৪ শতাংশ কাউকে বিষয়টি জানাননি। অর্থাৎ মানুষ আসছেন, কিন্তু যতজনের সাহায্য প্রয়োজন, সবাই এখনো সাহায্য চাইতে পারছেন না।

থেরাপির পাশাপাশি ট্রমা কাটাতে পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার ভূমিকা কতটুকু?

খুবই গুরুত্বপূর্ণ। থেরাপি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া শুধু থেরাপি দিয়ে সবসময় সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজনে ওষুধ খেতে হয়।

শৈশবের ট্রমা কাটাতে পরিবার কী করবে?

শিশুকে বিশ্বাস করা, দোষারোপ না করা, নিরাপদ পরিবেশ দেয়া, তার বয়স ও বোধের লেভেলে গিয়ে তাকে বোঝা, নিয়মিত কথা বলা এবং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয়া। প্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীকেও বলা দরকার, ‘তোমার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার জন্য তুমি দায়ী নও।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, ট্রমার পর পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক সমর্থন পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এটা জানা দরকার, পিটিএসডির কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে।

যারা বর্তমানে ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, বিশেষ করে স্ত্রীরা স্বামীর সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার মূল পরামর্শ কী?

আমার প্রথম কথা হবে, সহিংসতাকে স্বাভাবিক বা নিজের ভাগ্য বলে মেনে নেবেন না। প্রথমে নিজের এবং সন্তানের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিন। পরিস্থিতি বিপজ্জনক হলে একা মুখোমুখি সংঘাতে না গিয়ে বিশ্বস্ত আত্মীয়, বন্ধু বা নিরাপদ ব্যক্তির সহায়তা নিন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা, আইনি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সাহায্য নিন।

তার আগে নিজেকে বুঝুন। নিজের কোনো দোষ বা ঘাটতি আছে কি না, নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করুন এবং থাকলে সেটা সংশোধন করুন। অন্যের দোষ ধরা শুরু করলে নিজের দোষটা চাপা পড়ে যায়, পারস্পরিক সংকট তখন আরো বেড়ে যায়।

আর একটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ, ‘আমি সহ্য করলে সংসার বাঁচবে’—এ ধারণা সবসময় সঠিক নয়। দীর্ঘদিনের সহিংস পরিবেশে শিশুও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়; সাহায্য চাওয়া নিজের এবং সন্তানের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। বর্তমান বাংলাদেশের চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সহিংসতা কমানোর পাশাপাশি নীরবতা ভাঙা। কারণ ২০২৪ সালের জরিপে বিপুলসংখ্যক নারী সহিংসতার কথা কাউকে জানাননি।

সবশেষে বলব, শিশুর সামনে সহিংসতা শুধু পারিবারিক ঝগড়া নয়; শিশুর মনের নিরাপত্তাবোধের ওপর বিধ্বংসী আঘাতও। তাই নিরাপদ পরিবার তৈরি করাই সুস্থ প্রজন্ম তৈরির প্রথম শর্ত। পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু সহিংসতা বন্ধ করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নীরবতা ভাঙার প্রশ্নও।

একটি শিশুর সামনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি সংঘাত হয়তো তার শরীরে কোনো দাগ রেখে যায় না, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার সেই অভিজ্ঞতা মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারে। সেই ছাপ যেন তার ভবিষ্যৎ জীবন নির্ধারণ না করে, তার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পরিবার, সময়মতো সহায়তা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার চিকিৎসা।

আরও