শিশুদের খিঁচুনি কখন চিন্তার কারণ, কখন নয়

শিশুর খিঁচুনি কেবল কোনো শারীরিক কম্পন নয়, এটি মস্তিষ্কের এক জটিল সংকেত।

অনেক সময় শিশুর সাধারণ জ্বরজনিত খিঁচুনি দেখে বাবা-মা দিশেহারা হন। আবার কখনো গুরুতর স্নায়বিক সমস্যাকে সাধারণ দুর্বলতা ভেবে ভুল করেন। খিঁচুনি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ না করায় শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। অনিয়ন্ত্রিত ও চিকিৎসাবিহীন খিঁচুনির কারণে শিশুর মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি ও বিকাশজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শিশুর খিঁচুনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং জরুরি অবস্থা চেনা প্রয়োজন।

খিঁচুনি আসলে কী

মস্তিষ্ক কোটি কোটি নিউরনের সমন্বয়ে গঠিত। এ নিউরনগুলো একে অন্যের কাছে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানোর মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো কারণে মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশে বা পুরো মস্তিষ্কে হঠাৎ করেই এ বৈদ্যুতিক প্রবাহের ভারসাম্য নষ্ট কিংবা প্রচুর পরিমাণে অতিরিক্ত সিগন্যাল তৈরির জটিলতা দেখা দিতে পারে। এতে শরীর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় খিঁচুনি দেখা দেয়।

শিশুদের খিঁচুনিকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়

জ্বরজনিত খিঁচুনি: ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রার জ্বরের কারণে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো উত্তেজিত হয়ে খিঁচুনি তৈরি হয়। এটি সাধারণত শিশুর মস্তিষ্কের কোনো স্থায়ী ক্ষতি করে না। শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়।

মৃগীরোগ বা এপিলেপসি: যদি কোনো জ্বর বা তাৎক্ষণিক কারণ ছাড়াই শিশুর বারবার খিঁচুনি হতে থাকে, তবে সেটি মৃগীরোগের কারণে হতে পারে। এটি মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি একটি অবস্থা, যেখানে স্নায়ুগুলো জন্মগত ত্রুটি, আঘাত বা জেনেটিক কারণে অস্বাভাবিক সংকেত তৈরি করে।

নবজাতকের খিঁচুনি: জন্মের এক মাসের মধ্যে যে খিঁচুনি হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। এটি রক্তে গ্লুকোজ বা ক্যালসিয়ামের স্বল্পতা, জন্মের সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব কিংবা মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণের সংকেত হতে পারে।

ইনফেকশন বা প্রদাহজনিত খিঁচুনি: মেনিনজাইটিস বা মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ কিংবা এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের ভেতরের প্রদাহজনিত জটিল রোগে ভুগলে শিশুর শরীরে তীব্র খিঁচুনি হতে পারে।

কখন এটি জরুরি অবস্থা বা চিন্তার কারণ

যদি আপনার শিশুর খিঁচুনি নিচের বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সময়ক্ষেপণ না করে শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিন এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন—

 শিশুর খিঁচুনি যদি একটানা ৫ মিনিটের বেশি সময় স্থায়ী হয়।

 ৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি একাধিকবার খিঁচুনি হয়।

 খিঁচুনি থেমে যাওয়ার পরও যদি শিশু স্বাভাবিক আচরণ না করে।

 খিঁচুনির সময় যদি শিশুর শরীর নীল হয়ে যায় কিংবা শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট পায়।

 বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খিঁচুনির সমস্যার পাশাপাশি যদি শিশু পড়ালেখা বা কথা বলায় পিছিয়ে পড়ে কিংবা প্রায়ই তার ঘাড় শক্ত হয়ে যায়।

 যদি মাথায় বড় কোনো চোট বা আঘাত পাওয়ার পর শিশুর খিঁচুনি শুরু হয়।

কখন এটি চিন্তার নয়

উচ্চমাত্রার জ্বরের কারণে শিশুর খিঁচুনি হলে তাতে ভয় নেই। তবে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে শিশুর জ্বরের চিকিৎসা নিতে হবে।

খিঁচুনি স্বল্প সময় থাকে এবং খিঁচুনি শেষ হয়ে গেলে যদি শিশুটি আবার দ্রুততার সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

যদি শিশুর সার্বিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যেমন—বসা, হাঁটা, কথা বলা সঠিক সময়ে সম্পন্ন হয়। তবে শিশুর খিঁচুনি কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। খিঁচুনি দেখা দিলে গভীরভাবে শিশুকে পর্যবেক্ষণ করুন এবং খিঁচুনি বেশি সময় স্থায়ী হতে শুরু করলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

হঠাৎ খিঁচুনি হলে কী করবেন

 খিঁচুনি শুরু হলে শিশুকে একদিকে কাত করে সমান্তরাল বিছানায় শুইয়ে দিতে হবে। এ সময় শিশুর ঘাড় একটু সোজা করে রাখুন, যাতে শ্বাসনালিতে লালা ও বমি না ঢুকে যায়।

 শিশুকে জোর করে চেপে ধরে অথবা মাথায় পানি ঢেলে খিঁচুনি বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না।

 খিঁচুনিরত অবস্থায় কোনো কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন না।

 শিশুর মুখ, নাক দ্রুত পরিষ্কার করে দিতে হবে, যাতে মুখের ভেতর বমি ও লালা জমে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি না করে।

 খেয়াল করতে হবে শিশু শ্বাস নিচ্ছে কিনা। যদি না নেয়, তাহলে মুখে মুখে শ্বাস দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

 খিঁচুনিতে আক্রান্ত শিশুর বয়স ছয় মাসের কম হলে তাকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিন।

লেখক: নবজাতক, শিশু ও কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ

ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান, ঢাকা

আরও