লিউকেমিয়া কি বংশগত

লিউকেমিয়া হলো রক্ত ও অস্থিমজ্জার (বোন ম্যারো) এক ধরনের ক্যান্সার, যেখানে রক্ত তৈরির আদি কোষে জিনগত পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক শ্বেত রক্তকোষ দ্রুত বাড়তে থাকে।

এ অস্বাভাবিক কোষগুলো অস্থিমজ্জায় জমা হয়ে স্বাভাবিক লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা (প্লাটিলেট) তৈরির প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ফলে রক্তশূন্যতা, সংক্রমণ, রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়।

অনেকের মধ্যেই একটি সাধারণ প্রশ্ন থাকে, লিউকেমিয়া কি বংশগত? এর উত্তর হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লিউকেমিয়া সরাসরি বংশগত নয়। অর্থাৎ বাবা-মায়ের লিউকেমিয়া থাকলেই সন্তানের এ রোগ হবে, এমনটি নয়। অধিকাংশ লিউকেমিয়া জীবনের কোনো এক সময় রক্ত তৈরির কোষে নতুন করে ডিএনএতে পরিবর্তন হওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। এ পরিবর্তন সাধারণত উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নয় এবং তা পরবর্তী প্রজন্মে সরাসরি সঞ্চার হয় না।

তবে কিছু ক্ষেত্রে জেনেটিক বা বংশগত প্রবণতা রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন যাদের ডাউন সিনড্রোম, ফ্যানকোনি অ্যানিমিয়া, অ্যাটাক্সিয়া-টেলানজিয়েক্টাসিয়া, ব্লুম সিনড্রোম বা লি-ফ্রাউমেনি সিনড্রোম রয়েছে, তাদের লিউকেমিয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। একইভাবে পরিবারের একাধিক সদস্যের মধ্যে বিশেষ করে ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া থাকলে পরিবারের অন্য সদস্যদের ঝুঁকিও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে এটিও নিশ্চিতভাবে রোগ হবে, এমন নিশ্চয়তা দেয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লিউকেমিয়ার পেছনে জিনগত কারণের পাশাপাশি পরিবেশগত ও জীবনযাপনের নানা বিষয়ও ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন বেনজিনের মতো রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকা, উচ্চমাত্রার বিকিরণ (রেডিয়েশন), ধূমপান, পূর্বে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি গ্রহণ এবং কিছু বিরল রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা লিউকেমিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

লিউকেমিয়ার সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিন জ্বর থাকা, বারবার সংক্রমণ, দুর্বলতা ও ক্লান্তি, রক্তশূন্যতা, সহজে রক্তক্ষরণ বা শরীরে কালশিটে দাগ পড়া, রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, হাড় বা জয়েন্টে ব্যথা এবং ঘাড়, বগল বা কুঁচকির লিম্ফনোড ফুলে যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি।

বর্তমানে লিউকেমিয়ার চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং বোন ম্যারো বা হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন ব্যবহার করা হয়। অনেক ধরনের লিউকেমিয়া এখন যথাসময়ে শনাক্ত হলে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং অনেক রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনও ফিরে পান।

লিউকেমিয়া সাধারণ অর্থে বংশগত রোগ নয়। তবে কিছু নির্দিষ্ট জেনেটিক সিনড্রোম বা পারিবারিক প্রবণতা রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই পরিবারের কারো লিউকেমিয়া থাকলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতন জীবনযাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও