শিশুদের ক্যান্সারের মধ্যে লিউকেমিয়া সবচেয়ে বেশি দেখা যায়

ডা. চৌধুরী সামসুল হক কিবরীয়া

সহযোগী অধ্যাপক

শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগ

বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ)

সাধারণ সম্পাদক, পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ

শিশুদের ক্যান্সার প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যান্সার থেকে কীভাবে আলাদা?

শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যান্সারের উৎস এবং বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব, জীবনযাপন ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন ঝুঁকির বিষয় বেশি কাজ করে। অন্যদিকে শিশুদের ক্যান্সারে জেনেটিক বা বংশগত কারণের ভূমিকা তুলনামূলক বেশি। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যান্সার অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, কিন্তু শিশুদের ক্যান্সারের উপসর্গ দ্রুত দেখা দেয় এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করাও জরুরি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ক্যান্সারের চিকিৎসা জীবন দীর্ঘায়িত করলেও পুরোপুরি নিরাময় সবসময় সম্ভব হয় না। কিন্তু শিশুদের ক্যান্সারের বড় একটি অংশ সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব এবং তারা পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুদের ক্যান্সারের বর্তমান পরিস্থিতি কী?

উন্নত দেশগুলোয় সচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের কারণে শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসার ফলাফল অনেক ভালো। অনেক ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশের বেশি শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রধান সমস্যা হলো রোগ নির্ণয়ে দেরি হওয়া। বিশেষ করে কিডনি, লিভার, স্নায়ুতন্ত্রসহ বিভিন্ন সলিড টিউমারের ক্ষেত্রে রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে আসে, তখন অনেক সময় রোগ প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায় থেকে চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ফলে চিকিৎসার ফলাফলও কমে যায়। তবে সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গত ১০ বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশের শিশু ক্যান্সার চিকিৎসার মান ও ফলাফল অনেক উন্নত হয়েছে।

শিশুদের ক্যান্সার শনাক্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবন্ধকতা কী?

বর্তমানে আমাদের ডায়াগনস্টিক সুবিধা আগের চেয়ে অনেক উন্নত। তবে সাইটোজেনেটিকসসহ কিছু বিশেষায়িত পরীক্ষার ক্ষেত্রে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শিশুদের ক্যান্সারে জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ধরনের সব পরীক্ষা দেশে এখনো পুরোপুরি করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে নমুনা পাঠাতে হয়। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এসব সুবিধা আরো উন্নত করা গেলে চিকিৎসার ফলাফলও আরো ভালো হবে।

কোন লক্ষণগুলো দেখা দিলে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া উচিত?

দীর্ঘদিন জ্বর থাকা, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরও জ্বর না কমা, শরীরের কোথাও অস্বাভাবিক ফোলা বা গুটি দেখা দেয়া, ত্বকে অকারণে রক্তক্ষরণের দাগ বা কালচে দাগ হওয়া, দীর্ঘদিন দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া কিংবা শিশুর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে পরিবর্তন আসা—এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া পেটে গুটি অনুভব করা, হাড়ে ব্যথা ও ফোলা, শ্বাসকষ্ট বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপসর্গ থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোন ধরনের ক্যান্সার দেখা যায়?

শিশুদের মধ্যে লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এছাড়া লিমফোমা, ব্রেইন টিউমার, নিউরোব্লাস্টোমা, রেটিনোব্লাস্টোমা, কিডনির ক্যান্সার (নেফ্রোব্লাস্টোমা), লিভারের ক্যান্সার (হেপাটোব্লাস্টোমা) এবং বিভিন্ন ধরনের হাড়ের ক্যান্সারও দেখা যায়।

ব্রেইন টিউমারের লক্ষণ কী হতে পারে?

দীর্ঘদিন মাথাব্যথা, বিশেষ করে সকালে বেশি মাথাব্যথা হওয়া, বমি, মাথা ঘোরা, শরীরের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া কিংবা মাথার আকার অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যাওয়া—এসব ব্রেইন টিউমারের লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ থাকলে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।

লিউকেমিয়া সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।

লিউকেমিয়া মূলত অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারোর রোগ। এতে অপরিণত শ্বেত রক্তকণিকা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। ফলে স্বাভাবিক রক্তকণিকা উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। এতে রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ ও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ে। যেহেতু রক্ত পুরো শরীরে থাকে, তাই লিউকেমিয়া শুরু থেকেই সারা শরীরকে প্রভাবিত করে।

ক্যান্সার দ্রুত শনাক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

সলিড টিউমারের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে ৮০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। কিডনি টিউমার, রেটিনোব্লাস্টোমা বা অন্যান্য সলিড টিউমারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। রোগ যত দেরিতে ধরা পড়বে, চিকিৎসা তত জটিল হবে।

শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে একটি টিমওয়ার্ক। একজন সাধারণ চিকিৎসক থেকে শুরু করে রেডিওলজিস্ট, সার্জন, প্যাথলজিস্ট ও পেডিয়াট্রিক অনকোলজিস্ট—সবাই মিলে চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন। এ সমন্বয় যত ভালো হবে, চিকিৎসার ফলাফলও তত ভালো হবে।

চিকিৎসার সময় মানসিক সহায়তা কতটা প্রয়োজন?

কেমোথেরাপি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা শিশু এবং তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর একটি সময়। এ সময়ে পারিবারিক, মানসিক ও আর্থিক সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার যদি শিশুর পাশে থাকে এবং নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যায়, তাহলে অধিকাংশ শিশুই পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে।

ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুকে কতদিন ফলোআপে রাখতে হয়?

সাধারণত পাঁচ বছর পর্যন্ত নিয়মিত ফলোআপ করা হয়। প্রথম বছরে তিন মাস পর পর, পরবর্তী সময়ে ছয় মাস পর পর এবং পরে বছরে একবার করে পরীক্ষা করা হয়। পাঁচ বছর রোগমুক্ত থাকলে পুনরায় ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

সুস্থ হওয়ার পর শিশুরা কি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে?

অবশ্যই পারে। আমাদের অনেক রোগী এখন চিকিৎসক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশায় সফলভাবে কাজ করছেন। অনেকেই পরিবার গঠন করেছেন এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। এটি প্রমাণ করে সময়মতো চিকিৎসা পেলে শিশুদের ক্যান্সার নিরাময় সম্ভব।

আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কী?

সাইটোজেনেটিকস ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট—এ দুটি ক্ষেত্র আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট কিছু রোগীর জন্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা। তবে এটি এখনো দেশে পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সরকারি উদ্যোগে এসব প্রযুক্তি আরো বিস্তৃত করতে পারলে চিকিৎসার মান অনেক উন্নত হবে।

শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসাকে আরো কার্যকর করতে কী প্রয়োজন?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের মধ্যে বার্তাটি পৌঁছে দেয়া যে শিশুদের ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য। সচেতনতা বাড়াতে হবে, সরকারি উদ্যোগ জোরদার করতে হবে এবং গণমাধ্যমকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি হলে রোগী দ্রুত চিকিৎসা নেবে এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিও এদিকে আকৃষ্ট হবে।

ক্যান্সার নিয়ে সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারগুলো কীভাবে বাধা সৃষ্টি করে?

এখনো অনেকেই মনে করেন ক্যান্সার হলে আর বাঁচার সুযোগ নেই, চিকিৎসা করে লাভ নেই বা ক্যান্সার থেকে সুস্থ হওয়ার পর স্বাভাবিক জীবন সম্ভব নয়। এগুলো সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আবার কেউ কেউ মনে করেন ক্যান্সার হলে বিয়ে বা সন্তান নেয়া সম্ভব নয়, এটিও সত্য নয়। এসব ভুল ধারণা রোগীদের চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত করে।

চিকিৎসক হিসেবে কোনো স্মরণীয় অভিজ্ঞতা কি শেয়ার করবেন?

কর্মজীবনের শুরুতে একটি ছোট শিশুর চিকিৎসা করেছিলাম। পরে সে সংক্রমণে মারা যায়। ঘটনাটি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল এবং একসময় মনে হয়েছিল এ বিষয়ে কাজ করা কঠিন। কিন্তু পরে অনেক শিশুকে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেখে নতুন করে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। এখনো অনেক রোগী চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে, কেউ চিকিৎসক হয়েছে, কেউ শিক্ষক হয়েছে। একজন শিশুকে ক্যান্সারমুক্ত হতে দেখা একজন চিকিৎসকের জন্য অসাধারণ আনন্দের বিষয়। এ কারণেই আমরা আশাবাদ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।

আরও