হৃদরোগে কোলেস্টেরলের প্রভাব

বিশ্বের অন্যান্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে হৃদরোগের হার বাড়ছে।

বিশ্বের অন্যান্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশে হৃদরোগের হার বাড়ছে। হৃদরোগে আক্রান্তদের সবচেয়ে ভীতির কারণ হচ্ছে আকস্মিক মৃত্যু। বর্তমান বিজ্ঞানের এ যুগে এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পরও এ হৃদরোগজনিত আকস্মিক মৃত্যু পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। হৃদরোগের প্রধান কারণ হচ্ছে হৃদযন্ত্রের রক্তনালির গায়ে চর্বি জমা হওয়া। ফলে রক্তনালি ক্রমে সরু হতে থাকে, যাকে আমরা বলি রক্তনালির ব্লক। এতে হার্টে রক্ত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং হার্ট অ্যাটাক ও এনজাইনা সৃষ্টি করে।

হৃদরোগের ঝুঁকিগুলো

হৃদরোগ হওয়ার পেছনে অনেকগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকি একত্রে কাজ করে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, কোলেস্টেরল, জেনেটিক ফ্যাক্টর ইত্যাদিকে হৃদরোগের প্রধান ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়। সব ঝুঁকির মধ্যে রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রাকে হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। কারণ রক্তনালির গায়ে কোলেস্টেরল সরাসরি জমা হয়ে রক্তনালি সরু করে হৃদরোগের সৃষ্টি করে।

কোলেস্টেরল কী

কোলেস্টেরল একপ্রকার চর্বিজাতীয় পদার্থ, যা প্রাকৃতিকভাবে আমাদের শরীরে পাওয়া যায়। কোলেস্টেরল প্রাণীদেহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারণ এটি প্রতিটি কোষের কোষপ্রাচীর তৈরিতে প্রয়োজন হয়। তাছাড়া বাইল অ্যাসিড, ভিটামিন ডি ও স্টেরয়েড হরমোন এ কোলেস্টেরল থেকেই উৎপন্ন হয়।

যেসব ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল আমরা খাবার হিসেবে গ্রহণ করি, সেগুলো হজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে রক্তে প্রবেশ করে এবং লিভারে জমা হয়। পরবর্তী সময়ে এ চর্বি লিভারের মাধ্যমে কোলেস্টেরলে রূপান্তরিত হয় এবং এ কোলেস্টেরল লিপোপ্রোটিন নামে একপ্রকার আমিষের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে রক্তের মাধ্যমে আমাদের সারাদেহে প্রবাহিত হয়। যদি আমরা আমাদের খাবারে কোনো কোলেস্টেরল গ্রহণ না করি, তাহলেও আমাদের কোলেস্টেরলের অভাব হয় না। কারণ আমাদের লিভার শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী কোলেস্টেরল উৎপন্ন করতে পারে। স্বাভাবিক একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের গড়ে দৈনিক ২৫০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল প্রয়োজন হয়।

কোলেস্টেরলের প্রকারভেদ

কোলেস্টেরল সাধারণত তিন ধরনের। এলডিএল, এইচডিএল ও ভিএলডিএল কোলেস্টেরল। এলডিএল কোলেস্টেরলকে খারাপ কোলেস্টেরল বলা হয়। কারণ এ এলডিএল কোলেস্টেরল লিভার থেকে রক্তনালিতে কোলেস্টেরল নিয়ে যায় এবং রক্তনালিতে কোলেস্টেরল জমা করে রোগের সৃষ্টি করে। এলডিএল কোলেস্টেরলের পরিমাণ শতকরা ৬০-৭০ ভাগ। এইচডিএল কোলেস্টেরলকে ভালো কোলেস্টেরল বলা হয়। কারণ এ এইচডিএল কোলেস্টেরল রক্তনালি থেকে কোলেস্টেরল লিভারে নিয়ে আসে এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। রক্তে ভিএলডিএল কোলেস্টেরলের পরিমাণ শতকরা ১০-১৫ ভাগ এবং এলডিএল কোলেস্টেরলের মতো এ কোলেস্টেরলও ক্ষতিকারক।

রক্তনালিতে কোলেস্টেরল

স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চমাত্রায় যখন কোলেস্টেরল রক্তে প্রবাহিত হয়, সেসব কোলেস্টেরল রক্তনালির এন্ডোথেলিয়ামে আকৃষ্ট হয়ে লেগে থাকে। তাছাড়া উচ্চ রক্তচাপজনিত হরমোনের প্রভাব, ডায়াবেটিসজনিত অক্সিডাইজড গ্লুকোজ, চর্বি হতে নির্গত সাইটোকাইন ইত্যাদির প্রভাবে শ্বেত রক্তকণিকা রক্তনালির এন্ডোথেলিয়ামে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে শ্বেত রক্তকণিকা ও কোলেস্টেরল অণু রক্তনালির সবচেয়ে ভেতরের স্তর সাব-এন্ডোথেলিয়াল স্পেসে চলে যায় এবং ধীরে ধীরে সেখানে জমা হয়ে অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক প্ল্যাক তৈরি করে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্ল্যাক তৈরি হয় এবং বড় হতে থাকে। এ অ্যাথেরোস্ক্লেরোটিক প্ল্যাক রক্তনালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে হার্ট অ্যাটাক করে অথবা রক্তনালি আংশিক বন্ধ করে এনজাইনা সৃষ্টি করে।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

হৃদরোগ সৃষ্টিতে কোলেস্টেরল মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং এই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়। হৃদরোগে কোলেস্টেরলের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা, শারীরিক পরিশ্রম করা, নিয়মিত হাঁটা (প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন), ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজনে কোলেস্টেরলের জন্য ওষুধ সেবন করা।

লেখক: ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট

সিনিয়র কনসালট্যান্ট

ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ঢাকা।

আরও