সবচেয়ে লোভনীয় পেশার মানুষদেরই ক্যান্সারে মৃত্যুঝুঁকি বেশি

সাধারণ কর্মজীবী মানুষের তুলনায় ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের বিকিরণ-সম্পর্কিত ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। পাইলটদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ, আকর্ষণীয় ও লোভনীয় পেশা উড়োজাহাজ চালক বা পাইলট। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, সামাজিক মর্যাদা এবং তুলনামূলক উচ্চ আয়ের সুযোগ— সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে এ পেশার আকর্ষণ বরাবরই তুঙ্গে। কিন্তু এ চাকচিক্যময় পেশার আড়ালেও রয়েছে কিছু নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, জেট ল্যাগ এবং মহাজাগতিক বিকিরণের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা সে ঝুঁকিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

‘জামা ইন্টারনাল মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০টির বেশি পেশার মানুষের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। আর এসব তথ্য নেয়া হয় ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মৃত্যুসনদ থেকে।

গবেষণায় লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, মাল্টিপল মাইলোমা এবং ত্বক, স্তন, থাইরয়েড, প্রোস্টেট ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কয়েক ধরনের ক্যান্সারকে বিকিরণ-সম্পর্কিত ক্যান্সার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ ধরনের ক্যান্সারে মৃত্যুর হারের দিক থেকে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টরা ছিলেন সবার ওপর। আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন পাইলটরা।

সাধারণ কর্মজীবী মানুষের তুলনায় ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের বিকিরণ-সম্পর্কিত ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। পাইলটদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

পরম ঝুঁকির হিসাবেও রয়েছে পার্থক্য। ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের মোট মৃত্যুর প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল বিকিরণ-সম্পর্কিত ক্যান্সারের কারণে। অর্থাৎ এ পেশায় মারা যাওয়া প্রায় প্রতি ১৪ জনের একজনের মৃত্যুর সঙ্গে এ ধরনের ক্যান্সারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পাইলটদের ক্ষেত্রে এ হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। সাধারণ কর্মজীবীদের মধ্যে হার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ।

গবেষকদের মতে, বিমানকর্মীদের এ ঝুঁকির অন্যতম সম্ভাব্য কারণ মহাজাগতিক বিকিরণ। মহাকাশ থেকে আসা এ বিকিরণের বড় একটি অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল শোষণ করে নেয়। ফলে ভূপৃষ্ঠে থাকা মানুষের তুলনায় বিমানের মতো অনেক উপরের উচ্চতায় অবস্থানকারী ব্যক্তিরা বেশি আয়নাইজিং বিকিরণের সংস্পর্শে আসেন।

পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের দীর্ঘ সময় ধরে এবং নিয়মিত উড়োজাহাজে কাজ করতে হয়। ফলে সাধারণ যাত্রীদের তুলনায় তাদের দীর্ঘমেয়াদি মহাজাগতিক বিকিরণ-সংস্পর্শও বেশি।

গবেষণায় দেখা গেছে, পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের এমন ক্যান্সারে মৃত্যুর হার একইভাবে বেশি নয়, যেগুলোকে বিকিরণ-সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এ পার্থক্য পেশাগত বিকিরণ-সংস্পর্শ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকির মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয় বলে মত দেন গবেষকরা।

তবে বিমানকর্মীদের ক্যান্সারের বাড়তি ঝুঁকির পেছনে কেবল বিকিরণকে দায়ী করা যায় না। নিয়মিত জেট ল্যাগ, বিভিন্ন সময় অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত এবং অনিয়মিত কর্মঘণ্টাও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষকদের মতে, ঘন ঘন সময় অঞ্চল পরিবর্তনের কারণে শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটে। দীর্ঘমেয়াদি এ ধরনের পরিবর্তনও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে গবেষণাটির ফলাফলকে সরাসরি কারণ ও প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণার জন্য নেয়া ব্যক্তিরা কর্মজীবনে ঠিক কতটা বিকিরণের সংস্পর্শে এসেছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। ফলে তাদের ক্যান্সার ও মৃত্যুর সঙ্গে বিকিরণের সরাসরি কারণগত সম্পর্ক নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া মৃত্যুসনদে কোনো ব্যক্তির পেশাগত পরিচয় ভুলভাবে উল্লেখ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে গবেষকরা এ বিষয়ে আরো বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

আবার তারা এও বলেছেন, বিমানকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ উচ্চতায় কাজ করা পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের ক্যান্সারের সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে চিকিৎসকদের বাড়তি সতর্ক থাকা উচিত। ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়মিত ত্বক পরীক্ষা এবং নারী বিমানকর্মীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বয়স থেকে স্তন ক্যান্সারের স্ক্রিনিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।

গবেষণাটি মূলত বিমানকর্মীদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। আকাশপথে যাত্রী পরিবহন যত বাড়ছে, একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় উচ্চ আকাশে কাজ করা কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিয়মিত নজরদারির বিষয়টিও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আরও