হাড় ভাঙায় করণীয় কী কখন অস্ত্রোপচার জরুরি

প্রফেসর ডা. ফরিদ আহমেদ

ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র; হোক তা মাঠ কিংবা অফিস অথবা যুদ্ধক্ষেত্র, এ নিরন্তর ছুটে চলায় আমরা নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হই। হতে পারে তা খেয়ালের ভুলে কিংবা দুর্ঘটনার কারণে।

মানবসভ্যতার আদিম যুগ থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক যুগে এসেও মানুষের শারীরিক সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হাড় ভাঙা, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় ফ্র্যাকচার। ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র; হোক তা মাঠ কিংবা অফিস অথবা যুদ্ধক্ষেত্র, এ নিরন্তর ছুটে চলায় আমরা নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হই। হতে পারে তা খেয়ালের ভুলে কিংবা দুর্ঘটনার কারণে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের শরীরের হাড়। কখনো ভেঙে আলাদা হয়ে যায়, কখনো কয়েক টুকরো হয় অথবা চিড় ধরে। এমন হলে কোনোভাবেই সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

হাড় ভাঙার যত কারণ

বিভিন্ন কারণে আমাদের হাড় ভেঙে যেতে পারে। তীব্র আঘাত, হাড়ের দুর্বলতাজনিত রোগ ও মাত্রাতিরিক্ত চাপ— এগুলোই হাড় ভাঙার কারণ। তবে বয়স্কদের চেয়ে শিশুদের হাড় ভাঙার কারণ কিছু ক্ষেত্রে আলাদা।

শিশুদের হাড় ভাঙার কারণ

শিশুদের হাড়ের গঠন ও বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বড়দের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিশুদের হাড় অনেক বেশি নরম, নমনীয় এবং এতে রক্ত সঞ্চালন বেশি থাকে। ফলে তাদের হাড় যেমন অল্প আঘাতে ভেঙে যায়, তেমনি সঠিক চিকিৎসায় দ্রুত জোড়া লাগে। তাই শিশুদের হাড় ভাঙা বা ফ্র্যাকচারের ধরন এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়াও প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় আলাদা। শিশুদের হাড় ভাঙার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

দুরন্তপনা শিশুদের বৈশিষ্ট্য। খেলাধুলা, হইহুল্লোড়, ছোটাছুটি করতে পচ্ছন্দ করে। দৌড়াদৌড়ি, সাইকেল চালানো, স্কেটিং, খাট বা ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া অথবা খেলার মাঠে আঘাত পাওয়ার কারণে শিশুদের হাড় ভেঙে বা ফেটে যেতে পারে। এছাড়া শিশুদের শরীরে ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের অভাব থাকলে হাড় দুর্বল হয়ে সহজে ভেঙে যেতে পারে।

বয়স্কদের হাড় ভাঙার কারণ

বয়স্কদের হাড় ভাঙার অন্যতম কারণ হলো দুর্ঘটনা বা আঘাত পাওয়া। এছাড়া কোনো কারণে পড়ে গেলেও তাদের হাড়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অন্যসব কারণের মধ্যে রয়েছে খেলাধুলা, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্টিওপোরোসিস নামের হাড়ের রোগ, ক্যান্সার, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস। কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা বা থাইরয়েডের জটিলতা থাকলে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

হাড় ভাঙার যত ধরন ও চিকিৎসা

হাড় ভাঙার অনেকগুলো ধরন রয়েছে। এসব ধরনের প্রকৃতি নির্ণয় করে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

অ্যাভালশন ফ্র্যাকচার সবচেয়ে জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক। এতে ভাঙা হাড় টেন্ডন ও লিগামেন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার দরকার হয়।

ওপেন ফ্র্যাকচারকে কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচারও বলা হয়। এতে হাড় ভেঙে মাংস ও চামড়া ভেদ করে বাইরে চলে আসে। ফলে হাড়ের সঙ্গে কাদা-মাটি, ধুলোবালি মিশে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি সংক্রমণ এড়াতে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক ও টিটেনাস টিকা দিয়ে থাকেন।

ট্রান্সভার্স ফ্র্যাকচারের ক্ষেত্রে হাড় ভেঙে দুই ভাগ সমকোণ আকারে থাকে। এক্ষেত্রে স্প্লিন্ট বা কাস্টের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া হয়। আক্রান্ত অঙ্গ নড়াচড়াহীন রাখতে হয় এবং পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হয়। কখনো কখনো অস্ত্রোপচার দরকার হতে পারে।

কমিনিউটেড ফ্র্যাকচার হলে হাড় ভেঙে তিন বা তার অধিক টুকরো হয়ে যায়। অধিকাংশ সময়ই তা আর জোড়া লাগে না। অনেক সময় অঙ্গচ্ছেদের দরকার হতে পারে।

অব্লিক ফ্র্যাকচারে হাড় তির্যকভাবে ভেঙে যায়। এক্ষেত্রে হাড় প্রতিস্থাপনের জন্য অস্ত্রোপচার দরকার হয় এবং স্ক্রু দিয়ে হাড় যথাস্থানে জোড়া দিয়ে দেয়া হয়।

গ্রিনস্টিক ফ্র্যাকচার হলো গাছের নরম ডাল যেমন পুরোপুরি না ভেঙে উক্ত স্থানে বাঁকা হয়ে চিড় ধরে, এক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটে। এ ফ্র্যাকচারে হাড় পুরোপুরি না ভেঙে বাঁকা হয়ে যায় এবং চিড় ধরে। কাস্ট বা স্প্লিন্টের মাধ্যমেই এ ভাঙা হাড় জোড়া লাগানো যায়। গ্রিনস্টিক ফ্র্যাকচার শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি হয়।

হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার হলো হাড়ে সরু ফাটল, যা অধিকাংশ সময় রোগী বুঝতেই পারে না। ফলে এ ধরনের সমস্যায় ঝুঁকিও বেশি। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা না গেলে ধীরে ধীরে হাড়ভাঙার পরিমাণ বাড়তে থাকে। সাধারণত কাস্ট, স্প্লিন্ট বা বুটের আবরণের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা হয়।

কী করবেন

হাড় ভেঙে গেলে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। এমতাবস্থায় করণীয়—

 কোনোভাবেই কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। চিকিৎসা শুরু করতে যেন দেরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।

 আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বেঁধে দিতে হবে, যাতে রক্তক্ষরণ হতে না পারে।

 আহত ব্যক্তি মেরুদণ্ডে আঘাত পেলে তাকে হাসপাতালে নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অন্তত তিনজন মিলে রোগীকে এমনভাবে ধরুন যাতে রোগীর শরীর মোচড় না খায়। রোগীকে কোনোক্রমেই বসানো যাবে না। সোজা করে শুইয়ে হাসপাতালে নিতে হবে।

 হাত-পা বা আঙুলের ভাঙা স্থানের দুই পাশে শক্ত সাপোর্ট দিয়ে পরিষ্কার কাপড় বা গামছা দিয়ে হালকাভাবে বাঁধতে হবে, যাতে হাড় নড়াচড়া করতে না পারে।

আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে কোনো কিছু দিয়ে মালিশ করা যাবে না। রক্তপাত বন্ধ করতে পেস্ট, চুন, পান বা লতাপাতার রস লাগানো যাবে না।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থোপেডিকস বিভাগ

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

চেম্বার: ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান, ঢাকা।

আরও