হাইপোগ্লাইসেমিয়া

গর্ভাবস্থায় জটিলতা ও প্রতিরোধ

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেলে তাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়।

গর্ভকালীন সময়ে হরমোনগত পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের অনিয়ম, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম কিংবা ডায়াবেটিসের চিকিৎসাজনিত কারণে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাময়িকভাবে রক্তে শর্করা কমে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা তৈরি না করলেও বারবার বা দীর্ঘ সময় ধরে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে তা মা ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মায়ের জন্য সম্ভাব্য জটিলতা

প্রি-এক্লাম্পশিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি : গর্ভাবস্থায় বারবার তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঘটনা ঘটলে প্রি-এক্লাম্পশিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। প্রি-এক্লাম্পশিয়া হলো এমন একটি জটিল অবস্থা, যেখানে গর্ভবতী নারীর রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। চিকিৎসা না হলে এটি মা ও শিশুর জন্য জীবনহানিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি : রক্তে শর্করার মাত্রা বারবার ওঠানামা করলে শরীরের স্বাভাবিক গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে এ ধরনের অস্থিরতা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ায়।

দুর্বলতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি : হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারণে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, কাঁপুনি, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি ও কখনো কখনো অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ফলে পড়ে যাওয়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যা গর্ভবতী নারীর পাশাপাশি গর্ভের শিশুর জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা : দীর্ঘমেয়াদি বা নিয়মিত হাইপোগ্লাইসেমিয়া মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্বেগ, অস্থিরতা, বিরক্তি, বিষণ্ণতা ও ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব মানসিক চাপ গর্ভাবস্থার সামগ্রিক সুস্থতাকে ব্যাহত করে এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

ভ্রূণের জন্য সম্ভাব্য জটিলতা

মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে প্রভাব : গর্ভের শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত গ্লুকোজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে মায়ের রক্তে শর্করার ঘাটতি থাকলে ভ্রূণের মস্তিষ্কে গ্লুকোজ সরবরাহ কমে যেতে পারে। ফলে শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং জন্মের পর তার শেখার ক্ষমতা, আচরণ বা বিকাশে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।

কম জন্ম ওজন : অনিয়ন্ত্রিত হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত মায়েদের ক্ষেত্রে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে শিশু নির্ধারিত সময়ে জন্মালেও তার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে। কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুদের সংক্রমণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা এবং পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বেশি থাকে।

শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি : গুরুতর হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারণে ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পরিপক্বতা ব্যাহত হতে পারে। ফলে জন্মের পর শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

অকাল জন্মের সম্ভাবনা: কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত রক্তে শর্করার সমস্যা গর্ভাবস্থার জটিলতা বাড়িয়ে অকাল প্রসবের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। অকাল জন্ম নেয়া শিশুদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতা, সংক্রমণ ও বিকাশজনিত সমস্যার আশঙ্কা বেশি থাকে।

প্রতিরোধ ও করণীয়

গর্ভাবস্থায় হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ, দীর্ঘ সময় খালি পেটে না থাকা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা জরুরি। হঠাৎ দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, কাঁপুনি বা ঘাম হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শর্করাযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

গর্ভাবস্থায় হাইপোগ্লাইসেমিয়া অবহেলা করার মতো সমস্যা নয়। সময়মতো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মা ও শিশুর জন্য সম্ভাব্য জটিলতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

আরও