একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক...
দক্ষিণ কোরিয়ার মিহওয়া কিমের জীবন একসময় ঘুরপাক খেত প্রসাধনী ঘিরে। রূপচর্চার প্রতি প্রবল ভালোবাসা থেকে হোম শপিং অনুষ্ঠানের উপস্থাপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। প্রতিদিন ক্যামেরার সামনে নতুন নতুন প্রসাধনী ব্যবহার করে দেখাতেন, সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করতেন, দর্শকদের কাছে তুলে ধরতেন নানা সৌন্দর্যপণ্যের গল্প।
কিন্তু ২০১৩ সালে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সবকিছু বদলে দেয়। মুখ ও গলায় ৬০টিরও বেশি সেলাই পড়ে। শুধু শরীর নয়, ভেঙে পড়ে তার আত্মবিশ্বাসও। প্রায় ছয় মাস ঘর থেকে বের হননি। সূর্যের আলোও এড়িয়ে চলতেন। সেই সময় চলছিল তার ক্ষত সারানোর চিকিৎসা। আর সেখানেই তার পরিচয় হয় চিকিৎসায় ব্যবহৃত মেডিকেল-গ্রেড হাইড্রোজেল প্যাচের সঙ্গে।
হাইড্রোজেল প্যাচ বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে তৈরি করা হয়। নমনীয় এই জেল ত্বকের নিজস্ব নিরাময় প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে। আর এই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রসাধনী নিয়ে কিমের ধারণা বদলে যায়। পরে ২০২১ সালে তিনি ‘বায়োড্যান্স’ নামে নিজস্ব স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড চালু করেন।
বায়োড্যান্সের উৎপাদিত নানা রকমের স্কিনকেয়ার সামগ্রী ও তাদের জনপ্রিয় শিট মাস্ক। ছবি: সিএনএন
কিমের মতো অনেকেই এখন ঝুঁকছেন বায়োটেকনোলজি বা বায়োটেক বিউটির দিকে। ইস্ট ও ব্যাকটেরিয়ার মতো জীবন্ত অণুজীব ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব এবং নির্দিষ্ট সমস্যার কার্যকর সমাধান তৈরি করাই হলো বায়োটেক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রসাধনী রসায়নবিদ জিঞ্জার কিং জানান, প্রাকৃতিক উপাদানের গুণমান আবহাওয়া বা মাটির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু বায়োটেক প্রযুক্তিতে ফার্মেন্টেশন বা গাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপাদানের গুণগত মান সবসময় একই রকম রাখা সম্ভব হয়। এক সময় লরিয়াল বা শিসেইডোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে এখন ছোট ছোট স্বাধীন ব্র্যান্ডগুলোও বায়োটেক ব্যবহার করতে পারছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালে ৫৬০ কোটি ডলারের বায়োটেক স্কিনকেয়ার বাজার ২০৩২ সালের মধ্যে ৮৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।
বায়োটেক রূপচর্চায় কীভাবে ভিন্নতা আনছে, তার বড় উদাহরণ এমা লিউশাম। ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডে নিজস্ব ব্র্যান্ড চালু করার আগে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওলজি ও বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশোনা করেন। মাতৃত্বের সময়ে ত্বকের চিকিৎসার ক্ষতিকর রাসায়নিক এড়িয়ে চলতে গিয়ে তিনি কার্যকর কোনো প্রাকৃতিক বিকল্প পাননি। তাই বায়োটেকের মাধ্যমে ত্বকের নিজস্ব ক্রিয়াকলাপকে অনুকরণ করে এমন নিখুঁত ও নিরাপদ অণু তৈরি করা শুরু করেন তিনি। এমনকি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পিটার অ্যাগ্রেও সম্প্রতি বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবনা ও টেকসই পদ্ধতির জন্য তার কাজের প্রশংসা করেছেন।
এমা লিউশামের তৈরি বিশ্বমানের স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করছেন এক মডেল। ছবি: সিএনএন
ব্রিটিশ বিউটি এডিটর জোয়ানা এলনারও তার জীবনধারার পরিবর্তনের পর ২০২৩ সালে ‘রিওম’ নামে ব্র্যান্ড চালু করেন। দীর্ঘদিন গণমাধ্যমে কাজের পর তিনি লন্ডনে ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। এ সময় তিনি লক্ষ্য করেন, অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করে মানুষ উল্টো ত্বকের ক্ষতি করছে। রিওম বায়োটেক ল্যাবের সহায়তায় উদ্ভিদ কোষ থেকে প্রয়োজনীয় অণু তৈরি করে, যা প্রকৃতি থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা কঠিন। বায়োটেকের তৈরি এসব উপাদান ত্বকের গভীরে সহজে শোষিত হতে পারে।
তবে বাজারে হাজারো ব্র্যান্ডের ভিড়ে সঠিক প্রসাধনী বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কিম ও লিউশামের মতে, কেবল আকর্ষণীয় প্যাকেজিং বা যেকোনো একটি বিশেষ উপাদানের প্রতি অন্ধ না হয়ে ত্বকের সার্বিক যত্ন নেয় এমন ব্র্যান্ড বেছে নেয়া উচিত।
এলনারের মতে, কোনো উপাদানের মলিকুলার ওজন বা এটি ত্বকের কতটা গভীরে পৌঁছাতে পারছে, তা জানা জরুরি। তাই না বুঝে কেবল প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে নিজের ত্বকের ধরন বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আজ এই বায়োটেকনোলজি শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্যশিল্পের নতুন ভাষা হয়ে উঠছে। ইস্ট, ব্যাকটেরিয়া কিংবা উদ্ভিদকোষের সাহায্যে তৈরি হচ্ছে এমন সব উপাদান, যেগুলো একদিকে যেমন কার্যকর, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধবও। তাই প্রশ্ন উঠছে, স্কিন কেয়ারের ভবিষ্যৎ কি তাহলে সত্যিই বায়োটেকের হাতেই?
—সিএনএন থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে