বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর মেরুর আর্কটিক মহাসাগরের বরফ দ্রুত গলতে শুরু করেছে। আগে যেসব এলাকা বরফে ঢাকা থাকায় জাহাজ চলাচলের অনুপযোগী ছিল, এখন সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজের ভিড় বাড়ছে। তবে বাণিজ্যের এই নতুন সুযোগ উত্তর মেরুর পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিশেষ করে জাহাজ থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এই অঞ্চলের বরফ গলার গতিকে আরো ত্বরান্বিত করছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, ভয়াবহ এই দূষণ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, জাহাজের ভারী জ্বালানি পোড়ানোর ফলে যে কালো ধোঁয়া তৈরি হয়। এই ধোঁয়া বরফ ও তুষারের ওপর জমে সেগুলোর সাদা রং নষ্ট করে দেয়। ফলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত না হয়ে বরং বেশি তাপ শোষিত হয় এবং বরফ আরো দ্রুত গলতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে এক ধরনের চক্র তৈরি হচ্ছে—বরফ গলে নতুন পথ খুলছে, ফলে জাহাজ চলাচল বাড়ছে, আবার সেই জাহাজ থেকেই দূষণ বেড়ে বরফ আরো দ্রুত গলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ বছরের ব্যবধানে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় ব্ল্যাক কার্বন বা কালো ধোঁয়া প্রায় এক হাজার ৬০০ গুণ বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে সক্ষম। এই পরিস্থিতির কারণে আর্কটিক এখন পৃথিবীর অন্য যেকোনো প্রান্তের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জলবায়ু নিয়ে কাজ করা জোট ‘ক্লিন আর্কটিক অ্যালায়েন্স’-এর প্রধান উপদেষ্টা সিয়ান প্রায়র বলেন, এটি উষ্ণতা বাড়ার এক অন্তহীন চক্রে পরিণত হয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলে এ নির্গমন নিয়ন্ত্রণের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক নীতিমালা নেই। একদিকে বরফ গলছে, অন্যদিকে সেখানে বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির লড়াই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাতে জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়ে কৌশলগত আধিপত্যই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতিমালার বিরোধিতা করে আসছে। গত বছর জাহাজের জন্য ‘কার্বন ফি’ চালুর একটি প্রস্তাব মার্কিন লবিংয়ের কারণে পিছিয়ে দেয়া হয়।
এমনকি যেসব দেশ আর্কটিক অঞ্চলের সবচেয়ে কাছে অবস্থিত, তাদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থও এই দূষণ রোধে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসল্যান্ডের উদাহরণ টেনে পরিবেশবাদীরা বলছেন, দেশটি সবুজ প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও তাদের প্রভাবশালী মৎস্য শিল্প জ্বালানি পরিবর্তনের প্রস্তাব মানতে নারাজ। পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের কর্মী আর্নি ফিনসন জানান, এই শিল্প মুনাফা নিয়ে খুশি হলেও পরিবেশ রক্ষায় বাড়তি কর বা বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। ফলে সরকারও পরিবেশ রক্ষার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে আর্কটিক অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উত্তর মেরুর এই অঞ্চলে জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে জাহাজগুলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়েছে ১১১ শতাংশ। ২০১৯ সালে যেখানে জাহাজ থেকে দুই হাজার ৬৯৬ টন কালো ধোঁয়া নির্গত হতো, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১০ টনে। বর্তমানে আর্কটিকের দূষণের জন্য সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে।
ফ্রান্স, জার্মানি ও ডেনমার্কের মতো দেশগুলো এখন আর্কটিক অঞ্চলে হালকা এবং কম দূষণকারী ‘পোলার ফুয়েল’ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে অনেক জাহাজ কোম্পানি এশীয় ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াতের সময় বাঁচাতে আর্কটিকের সংক্ষিপ্ত পথ ব্যবহার করতে চায়। যদিও এমএসসির মতো বড় কিছু কোম্পানি পরিবেশ রক্ষায় এই পথ ব্যবহার না করার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাণিজ্যিক লাভের লোভে আর্কটিকের ভবিষ্যৎ এখন বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
— এপি অবলম্বনে