ইবনে খালদুনের সময়টা এমন যে সে সময়ের প্রায় সব আরব পণ্ডিতকে সুফি মনে করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। সে হিসেবে ইবনে খালদুনকেও সুফি মনে করা হয়। তবে ইবনে খালদুনের ক্ষেত্রে সুফিবাদের আছে আলাদা মাত্রা। সুফিবাদকে ইবনে খালদুন ধর্মীয় বিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছিলেন। তার দৃষ্টিতে এটি কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার পথ নয়, বরং বিশ্বকে জানার ও বোঝার একটি উপায়ও ছিল।
যারা সুফি তরিকা বা ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত, তারা সাধারণত একটা না একটা তরিকা অনুসরণ করেন। তাদের তরিকার উৎসকে এক আধ্যাত্মিক শায়খদের শৃঙ্খলের মাধ্যমে মহানবীর কাছে পৌঁছায় বলে দাবি করা হয়। তবে বহিরাগতরা বিশেষত পাশ্চাত্য গবেষকেরা সুফিবাদের সূচনা কিছুটা পরে অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে বলে প্রচার করতে আগ্রহী। কিছু গবেষক আবার সুফিবাদের প্রাথমিক বিকাশে খ্রিস্টীয়, হিন্দু, অজ্ঞেয়বাদ ও বৌদ্ধ প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছেন।
প্রথম যুগের সুফিরা ছিলেন একক সাধক। তখনো কোনো সংগঠিত তরিকা গড়ে ওঠেনি। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তরিকা গঠিত হতে শুরু করে। উত্তর আফ্রিকায় শাধিলি ও কাদেরি তরিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১২২৮ সালে তিউনিসে প্রথম শাধিলি জাওয়িয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, ইবন খালদুন অল্প সময়ের জন্য কায়রোর একটি খানকার শায়খ হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। খানকা ও জাওয়িয়া উভয়ই সুফি কেন্দ্র হলেও তাদের প্রকৃতিতে পার্থক্য ছিল। খানকা মূলত সুফিদের জন্য এক ধরনের আবাসস্থল, যার শায়খকে নিয়োগ দিতেন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে জাওয়িয়া পরিচালনা করতেন নির্দিষ্ট তরিকার শায়খ। সেখানে তার অনুসারীরা অবস্থান করতেন এবং তিনি তাদের জন্য বিশেষ আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও অনুশাসন প্রদান করতেন।
একাদশ শতাব্দীতে ইমাম গাজ্জালির রচনাবলি সুফিবাদের একটি মধ্যপন্থী রূপকে সুন্নি ইসলামের মূলধারায় গ্রহণযোগ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার লেখাগুলো ইবন খালদুনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মুকাদ্দিমাতেও তা ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। তার ইহইয়া উলুম আদ-দীন ছিল ধর্মীয় মুক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ দিশারি, যা চারটি ভাগে বিভক্ত: ইবাদত, সামাজিক আচরণ, নৈতিক দোষ ও নৈতিক গুণাবলি। তিনি দেখিয়েছিলেন শরিয়াহ মূলত সমাজের কল্যাণ ও জনস্বার্থ রক্ষার জন্য প্রণীত। উত্তর আফ্রিকার শাধিলি সুফিরা ইহইয়াকে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করত। যদিও আল-গাজ্জালি এতে সুফিবাদ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, তিনি মূলত সুফিদের আচরণ নিয়ে লিখেছেন; ‘মুকাশাফা’ বা ইন্দ্রিয়গত পর্দা অপসারণের বিষয়টি তিনি লিখিত আলোচনার বাইরে রেখেছিলেন, কারণ এটি ছিল কেবল দীক্ষিতদের জন্য সংরক্ষিত।
তিউনিসিয়ার এই মসজিদে পড়াশোনা করেছেন ইবনে খালদুন। ছবি: ওয়েল ঘাবারা
চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সুফি তরিকা ইসলামী সমাজে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। উত্তর আফ্রিকায় মেরিনিদ শাসক আবু ইনান সুফিদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে সময়ের অনেক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, যেমন ইবন আল-খাতিব ও ইবন মারযুক ছিলেন সুফি। সুফিবাদ এতটাই ব্যাপক ছিল যে অনেক ক্ষেত্রে এটি সুন্নি ইসলামের প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। যেমন মাইকেল কুক মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা হয়তো সুফিবাদকে ইসলামের বিকল্প রূপ হিসেবে ভাবতে পারি, যদি না বহু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটি নিজেই ইসলাম হয়ে উঠত।’
তবু ইবন খালদুন তার মুকাদ্দিমাতে সুফি তরিকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেননি। এটি তার পাঠক ও গবেষকদের বিস্মিত করে। তিনি বরং মনোযোগ দিয়েছেন কোনটি প্রকৃত বা গ্রহণযোগ্য সুফি মতবাদ এবং কোনটি নয়। যদিও আলেম সমাজের অনেকেই সুফিবাদ গ্রহণ করেছিলেন, কিছু সুফি মতবাদ ও চর্চা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল জিকির, সামা (গান ও নৃত্য), সুফি শায়খদের মাজারভিত্তিক আচারের দিকে।
ইবন খালদুন নিজে সুফি ছিলেন কিনা প্রশ্নটি জটিল। তিনি এমন এক সময়ে বাস করতেন যখন সুফিবাদ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। তার অনেক সহকর্মী ও প্রতিদ্বন্দ্বী সুফি ছিলেন। তবু তিনি কখনো নিজেকে সুফি বলে উল্লেখ করেননি, কিংবা ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার বর্ণনাও দেননি। তার সমসাময়িকরাও তাকে সুফি হিসেবে উল্লেখ করেননি। তবু পরোক্ষ প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে তিনি সুফিবাদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।
তিনি সুফি শিক্ষক আবু মাহদি ইবন আল-জাইয়াতের অধীনে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং মুকাদ্দিমাতে তাকে ‘আমাদের শায়খ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সুফি তত্ত্ব নিয়ে শিফা আল-সাইল নামের একটি গ্রন্থও রচনা করেন, যেখানে তিনি বলেন, আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য মুরশিদ অপরিহার্য; অন্যথায় পথভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তবে তিনি সুফিবাদের কিছু দিক নিয়ে সংশয়ী ছিলেন। ইবনে আরাবি ও ইবনে ফরিদের রচনায় তিনি বিপদের সম্ভাবনা দেখেছিলেন—বিশেষত একত্মবাদ, তাজাল্লি ও অক্ষর তত্ত্বের মতো ধারণায়। তার মতে, এসব ধারণা ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে এবং সুফিবাদকে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতেন এবং মনে করতেন সুফিরা কারামাত প্রদর্শন করতে সক্ষম। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক ছিলেন যে কিছু সুফি মতবাদ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপদের কারণ হতে পারে, বিশেষত যখন তা শিয়া মতবাদের প্রভাব গ্রহণ করে।
পরবর্তীকালে তার মনোভাব আরো কঠোর হয়ে ওঠে। মিসরে অবস্থানকালে প্রদত্ত একটি ফতোয়ায় তিনি কিছু সুফি চিন্তাবিদকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দেন এবং তাদের রচনা ধ্বংস করার আহ্বান জানান। তিনি মনসুর হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ডকেও সমর্থন করেন।
আধুনিক গবেষক অ্যালেন ফ্রমহার্জ মনে করেন, সুফিবাদ ইবন খালদুনের ইতিহাস চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার মতে, বাহ্যিক ঘটনার আড়ালে অন্তর্নিহিত সত্য অনুসন্ধান—এ প্রবণতা সুফি দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তবে এ মত সর্বজনস্বীকৃত নয়। অনেকেই মনে করেন, ইতিহাসের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুসন্ধান কেবল সুফিবাদের বৈশিষ্ট্য নয়।
সবশেষে বলা যায়, ইবন খালদুন সম্ভবত একজন সুফি ছিলেন, কিন্তু তার চিন্তাভাবনা কেবল সুফিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন এক জটিল ও বহুমাত্রিক চিন্তাবিদ, যিনি আধ্যাত্মিকতা ও যুক্তিবাদের মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন।
[রবার্ট আরউইন রচিত ‘ইবনে খালদুন: অ্যান ইন্টেলেকচুয়াল বায়োগ্রাফি’র ‘দ্য সুফি মিস্টিক’ অধ্যায় অবলম্বনে]