এআই যেভাবে বদলে দিয়েছে চীনের মাইক্রোড্রামার জগৎ

প্রযুক্তিটি একদিকে অভিনয় ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট বহু পুরনো কাজ বিলুপ্ত করছে, অন্যদিকে তৈরি করছে এআই সম্পাদক, প্রম্পট প্রকৌশলী, প্রোগ্রামার ও ডিজাইনারের মতো নতুন পেশা। তবে এ পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

চীনের পূর্বাঞ্চলীয় চেচিয়াং প্রদেশের হেংদিয়ান শহর পরিচিত ‘চীনের হলিউড’ নামে। বিশাল চলচ্চিত্র স্টুডিও, রাজপ্রাসাদের অনুকরণে তৈরি সেট এবং ব্যস্ত শুটিং ইউনিটের জন্য শহরটির খ্যাতি দীর্ঘদিনের। হেংদিয়ানের মাইক্রোড্রামা শিল্পে এরই মধ্যে নেমে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। কয়েক মাস আগেও শহরটির বিভিন্ন সেটে দিনরাত শুটিং চলত। এখন একের পর এক সেট নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর ভিডিও তৈরির প্রযুক্তি।

নতুন প্রজন্মের এআই টুল ব্যবহার করে প্রচলিত নির্মাণ ব্যয়ের সামান্য অংশ খরচ করেই তৈরি করা যাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ মাইক্রোড্রামা। ফলে চীনজুড়ে সরাসরি অভিনেতা ও কলাকুশলী নিয়ে নির্মিত প্রযোজনার সংখ্যা দ্রুত কমছে। বিপরীতে ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো ভরে উঠছে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি মাইক্রোড্রামা মুক্তি পেয়েছে। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি হয়েছে এআই ব্যবহার করে।

চীনের দ্রুতগতির এআই রূপান্তর কীভাবে মানুষের জীবিকা বদলে দিচ্ছে, মাইক্রোড্রামা শিল্প তার দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিটি একদিকে অভিনয় ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট বহু পুরনো কাজ বিলুপ্ত করছে, অন্যদিকে তৈরি করছে এআই সম্পাদক, প্রম্পট প্রকৌশলী, প্রোগ্রামার ও ডিজাইনারের মতো নতুন পেশা। তবে এ পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

হেংদিয়ানে কর্মরত ২৪ বছর বয়সী অভিনেত্রী জুনলিন জানান, সরাসরি অভিনয়নির্ভর প্রযোজনায় এখন ‘তীব্র শীতকাল’ চলছে। আগে মাসের প্রায় ২৫ দিনই শুটিং করতেন তিনি। কিন্তু গত জুনে কাজ পেয়েছেন মাত্র সাতদিন। জুনলিন বলেন, ‘প্রযোজনা কমে যাওয়ায় শিল্পীদের টিকে থাকার জায়গা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। শুটিং না থাকলে আমি সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকি।’

গত জুনে চীনের হেংদিয়ানে একটি মাইক্রোড্রামার সেটে মোবাইল ফোনে দেখার উপযোগী করে দৃশ্য ধারণ করছেন এক ক্যামেরাকর্মী ছবি: সিএনএন

মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মতো দৈর্ঘ্যের পর্ব নিয়ে তৈরি হয় মাইক্রোড্রামা। কভিড মহামারীর সময় সিনেমা হল ও স্টুডিও বন্ধ হয়ে গেলে চীনে এ ধরনের কনটেন্ট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দৌইন ও কুয়াইশৌর মতো শর্ট ভিডিও প্লাটফর্মের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে সহজেই এসব নাটক দেখা যায়। প্রতিটি পর্ব ছোট হলেও সব পর্ব মিলিয়ে কাহিনীর দৈর্ঘ্য অনেক সময় একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সমান হয়।

দুষ্ট শাশুড়ি, পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি, যুদ্ধকালীন বীরত্ব কিংবা প্রতারিত প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আবেগনির্ভর ও অতিনাটকীয় কাহিনী এসব নাটকে বেশি দেখা যায়। চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে মাইক্রোড্রামা। এরই মধ্যে এটি বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডাটাআইয়ের হিসাবে, গত বছর চীনের অভ্যন্তরীণ মাইক্রোড্রামা বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এটি দেশটির প্রেক্ষাগৃহনির্ভর চলচ্চিত্র বাজারের প্রায় দ্বিগুণ।

মাইক্রোড্রামার উত্থান চীনে উচ্চ যুব বেকারত্বের সময়ে তরুণ অভিনেতা, পরিচালক ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবীর জন্য বিপুল কাজের সুযোগ তৈরি করেছিল। ২৭ বছর বয়সী অভিনেতা বি চিকিয়াং ২০২১ সালে হেংদিয়ানে আসেন। তার ভাষায়, ‘মাইক্রোড্রামা জনপ্রিয় হওয়ার পর কাজ করতে চাইলে চরিত্রের অভাব হতো না। অভিনয় বা চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা না করা অনেকেও সুযোগের কারণে এ শিল্পে যোগ দিয়েছিলেন।’

গত বছর হাজার হাজার নির্মাণ ইউনিট হেংদিয়ান ও আশপাশে মাইক্রোড্রামার শুটিং করেছে। চিংদাও, সিয়ান ও চেংচৌর মতো শহরেও তৈরি হয়েছিল নতুন নির্মাণকেন্দ্র। সেখানে কৃত্রিম প্রাসাদ, করপোরেট বোর্ডরুম ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মতো সেট গড়ে তোলা হয়।

তবে দ্রুত কনটেন্ট তৈরির প্রতিযোগিতা শিল্পটিকে এক ধরনের চাপের কারখানায় পরিণত করেছিল। একটি নাটক ভাইরাল হওয়ার আশায় নির্মাতারা যত বেশি সম্ভব প্রযোজনা শেষ করতে চাইতেন। বাজেটের মধ্যে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সমান কাহিনী প্রায় এক সপ্তাহে ধারণ করতে অভিনেতা ও কলাকুশলীদের দিনে ১৮-২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। আর একেবারে নিচের স্তরে থাকা অতিরিক্ত শিল্পীরা ঘণ্টায় মাত্র ১০ ইউয়ান বা দেড় ডলারের মতো মজুরি পেতেন।

গত জানুয়ারিতে একটি মাইক্রোড্রামার দৃশ্যে কাল্পনিক সম্রাজ্ঞী ঝাং সিয়াওলির (ডানে) ব্যক্তিগত পরিচারিকার চরিত্রে চুয়াং ওয়েনচিয়ে (বাঁয়ে) ছবি: চুয়াং ওয়েনচিয়ে

এ পরিস্থিতির মধ্যেই বাজারে আসে বাইটড্যান্সের এআই ভিডিও তৈরির টুল সিড্যান্স ২.০। অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবের মতো দেখতে এআই ভিডিওয় ছেয়ে যায় চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মাইক্রোড্রামার বাজারে প্রযুক্তিটির বিস্তারের জন্য বাইটড্যান্সের বিশেষ সুবিধাও রয়েছে। চীনের দুটি প্রধান মাইক্রোড্রামা প্লাটফর্ম দৌইন ও হোংগুওর মালিক প্রতিষ্ঠানটি। চিত্রনাট্য তৈরিতে ব্যবহারের জন্য তাদের কাছে কপিরাইটযুক্ত উপন্যাসের বড় সংগ্রহও রয়েছে।

কুয়াইশৌ, আলিবাবা ও এআই প্রতিষ্ঠান মিনিম্যাক্সও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় প্রতিদ্বন্দ্বী ভিডিও তৈরির প্রযুক্তি চালু করেছে। একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, পাঁচ সদস্যের একটি দল এআই ব্যবহার করে সাধারণ মানের ১২০ মিনিটের প্রকল্প প্রায় এক সপ্তাহে তৈরি করতে পারে। এতে ব্যয় হয় আনুমানিক ১৫ হাজার ইউয়ান বা ২ হাজার ২০০ ডলার। সরাসরি অভিনেতা ও কলাকুশলী নিয়ে একই ধরনের প্রযোজনা তৈরির সর্বনিম্ন ব্যয়ের তুলনায় এটি এক-দশমাংশেরও কম।

ডাটাআইয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে শুধু দৌইনেই ২ লাখ ২০ হাজার নতুন এআইনির্ভর মাইক্রোড্রামা মোট ৫০ হাজার কোটি বার দেখা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ছিল অ্যানিমেশন। তবে মার্চের পর তৈরি অর্ধেকের বেশি নাটকে বাস্তব মানুষের মতো দেখতে এআই চরিত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

কাজ হারিয়ে অনেক অভিনেতা ও কলাকুশলী এরই মধ্যে হেংদিয়ান ছেড়েছেন। ২৮ বছর বয়সী অভিনেত্রী চুয়াং ওয়েনচিয়ে ফেব্রুয়ারিতে চীনা নববর্ষের ছুটি শেষে শহরটিতে ফিরে দেখেন রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআইনির্ভর নাটকের সংখ্যা বাড়লেও প্রথমে তিনি এর সঙ্গে কাজ কমে যাওয়ার সম্পর্ক বুঝতে পারেননি। পরে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এপ্রিলে হেংদিয়ান ছেড়ে চলে যান তিনি।

যারা রয়ে গেছেন, তাদের আয়ও ব্যাপকভাবে কমেছে। আগে যে প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কয়েক হাজার ইউয়ান পাওয়া যেত, এখন কোনো কোনো অভিনেতাকে একই কাজের জন্য দিনে মাত্র ৩০০ ইউয়ান বা প্রায় ৪৫ ডলার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। ২৯ বছর বয়সী অভিনেতা লিউ ইউচান আগে প্রতি মাসে নিয়মিত চারটি নতুন চরিত্রে অভিনয় করতেন। বর্তমানে জীবিকা নির্বাহের জন্য তাকে খাবার সরবরাহের কাজও করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ির ঋণ আছে এবং মা-বাবার অবসরকালীন ব্যয়ের দায়িত্বও আমার। বর্তমান বাজারে মাইক্রোড্রামা থেকে পাওয়া আয় দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।’

অভিনেতাদের কাজের বিজ্ঞপ্তি দেয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপেও এখন এআই সম্পাদক, প্রোগ্রামার, ডিজাইনার ও চিত্রনাট্যকার চেয়ে বিজ্ঞাপন বেশি দেখা যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে বাজারে এসেছে নতুন একদল উদ্যোক্তা। তাদের একজন ২১ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তান চেন। গত এপ্রিলে তার স্টার্টআপ এআইনির্ভর মাইক্রোড্রামা নির্মাণ শুরু করে।

তানের দল কোনো উপন্যাস বা চিত্রনাট্যকে সংক্ষিপ্ত করে তাতে উত্তেজনা ও রহস্য বাড়ায়। এরপর চরিত্র ও সেটের চেহারা নির্ধারণ করে স্টোরিবোর্ড তৈরি করা হয়। ‘কার্ড-পুলার’ নামে পরিচিত কর্মীরা প্রম্পট ব্যবহার করে একই দৃশ্যের ভিডিও বারবার তৈরি করেন। কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার পর সেসব ক্লিপ সম্পাদনা করে পূর্ণাঙ্গ নাটক বানানো হয়।

তবে নতুন এআইনির্ভর পেশাগুলোতেও এরই মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে প্রতি মিনিট ভিডিও তৈরির জন্য তানের প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ হাজার ইউয়ান পেত। এখন কোনো কোনো প্রকল্পে প্রতি মিনিটের মূল্য নেমে এসেছে ১৫০ ইউয়ানে। বিপুলসংখ্যক প্রোগ্রামার ও মধ্যস্থতাকারী বাজারে প্রবেশ করায় নির্মাতাদের মুনাফা দ্রুত কমছে। তান চেনের মতে, দ্রুত সম্প্রসারিত বাজারটিতে ‘এক ধরনের বুদ্‌বুদ’ তৈরি হয়েছে।

এআই দিয়ে বাস্তব অভিনেতার চেহারার মতো চরিত্র তৈরির বিষয়টিও নতুন আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। অনুমতি ছাড়া চেহারা ব্যবহারের অভিযোগে চীনের অন্তত একজন পরিচিত অভিনেতা আদালতের নির্দেশে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ শিল্পীর পক্ষে নিজের চেহারা নকল করার বিষয়টি প্রমাণ করা কঠিন।

৩১ বছর বয়সী অভিনেত্রী ইউ শুতিয়ান সম্প্রতি ভক্তদের মাধ্যমে জানতে পারেন, একটি এআই চরিত্রের সঙ্গে তার চেহারার ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। তিনি মনে করেন, নিজের মুখ এআইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে চরিত্রটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হওয়ায় আইনি ব্যবস্থা নেননি। বরং পরিচালনায় মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি নিজেই এআই ব্যবহার শুরু করেছেন। তার ভাষায়, ‘এআইকে থামানো যাবে না। তাকে হারাতে না পারলে তার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। তাই আমি যুক্তিসংগতভাবে প্রযুক্তিটিকে গ্রহণ করার পথ খুঁজছি।’

চীনে মাইক্রোড্রামার বিষয়বস্তু নিয়েও নজরদারি বাড়ছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন বিধিতে এসব নাটকের কাহিনীকে ‘সঠিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা’ অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে হোংগুওসহ কয়েকটি প্লাটফর্ম এআইনির্ভর নাটকের নির্মাণমান উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের পরও বাস্তব অভিনেতাদের নিয়ে তৈরি নাটকের চাহিদা পুরোপুরি শেষ হয়নি। হোংগুওর শীর্ষ ১০ কনটেন্টের তালিকায় এআই প্রযোজনা ও কার্টুনের পাশাপাশি এখনো স্থান পাচ্ছে ‘বাস্তব মানুষের নাটক’। ফলে মানুষের আবেগ প্রকাশ এবং গল্প বলায় অভিনেতাদের ভূমিকা শেষ পর্যন্ত কতটা থাকবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়।

জুনলিন মনে করেন, এআই মানুষের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ গভীরতা প্রকাশ করতে পারে না। তাই প্রযুক্তিটি একজন প্রকৃত অভিনেতাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। তবে নিজের মতো নতুন ও তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত শিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি শঙ্কিত। তার কথায়, ‘এআই একজন বাস্তব মানুষকে কখনই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। কিন্তু এটি হয়তো আমাকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে।’ সিএনএন অবলম্বনে

আরও