নীল নদের তীরে স্বর্ণ খোঁজার অভিশাপ— উর্বর জমি হারাচ্ছে সুদান

খনি থেকে পাওয়া বর্জ্য বা টেইলিংসে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত স্বর্ণ থাকে। এসব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সায়ানাইড, পারদ ও থায়োইউরিয়ার মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। বৃষ্টির পানি ও বন্যার সঙ্গে এসব রাসায়নিক মিশে কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মাটির লবণাক্ততা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে এবং খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে

নীল নদের তীরের আবু হামাদ একসময় ছিল সবুজে ঘেরা শহর। এখানকার বাগান ও কৃষিজমিতে খেজুর, কমলালেবুসহ বিভিন্ন ফল এবং শীতকালীন শস্য উৎপাদিত হতো। এসব কৃষিপণ্য পূর্ব সুদানের বিভিন্ন অঞ্চল— এমনকি রাজধানী খার্তুম ও পোর্ট সুদানেও সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের কারণে সুদানে ক্ষুদ্র পরিসরের স্বর্ণ খনি দ্রুত বাড়ছে। আর এ অনুসন্ধানে মাটি, পানি ও পরিবেশে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে দেশটির কৃষি ও জনস্বাস্থ্য বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, আবু হামাদ শহরের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কৃষিজমি পরিষ্কার করে সেখানে গড়ে উঠেছে দোকান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। শহর ও আশপাশে ছড়িয়ে আছে সাত শতাধিক বর্জ্যের স্তূপ। এসব বর্জ্য মাটি, পানি ও বাতাসকে দূষিত করছে।

এ শহরে ক্ষুদ্র পরিসরে স্বর্ণ উত্তোলন শুরু হয় ২০০৮ সালে। তবে গত ছয় বছরে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ২০২৪ সালে সুদানের মোট স্বর্ণ উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে ক্ষুদ্র খনি থেকে। আবু হামাদ এখন দেশটির অন্যতম বড় স্বর্ণ উত্তোলন ও বাণিজ্যকেন্দ্র।

খনি থেকে পাওয়া বর্জ্য বা টেইলিংসে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত স্বর্ণ থাকে। এসব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সায়ানাইড, পারদ ও থায়োইউরিয়ার মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। বৃষ্টির পানি ও বন্যার সঙ্গে এসব রাসায়নিক মিশে কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মাটির লবণাক্ততা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে এবং খাদ্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

সুদানের কৃষক মোহাম্মদ ফাথি আল-রহমান আল-খলিফা জানান, কয়েক বছর আগে প্রথম ফলনেই প্রায় চার ট্রাক কমলা পাওয়া যেত। এখন সেখানে ফলন হয় আধা ট্রাকেরও কম। গমের উৎপাদন একরপ্রতি ৪০-৬০ বস্তা থেকে কমে ১২-১৮ বস্তায় নেমে এসেছে। ফাভা বিনের উৎপাদনও প্রতি ফেদ্দান বা প্রায় এক একরে ৪০-৫০ বস্তা থেকে কমে মাত্র ৩-৪ বস্তায় দাঁড়িয়েছে।

আল-খলিফার আশঙ্কা, খাদ্যনিরাপত্তার সংকট এখন আর স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সমস্যা হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন শহরে সবজি ও কৃষিপণ্যের দামও বাড়ছে।

শুধু কৃষিজমিই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পশুপালনও। পশুপালক আবু আল-কাসিম আল-খাজিন জানান, কিছু পশু লোম ছাড়াই জন্ম নিচ্ছে, কিছু পশুর চোখ নেই। কোনো কোনো পশুর আচরণেও অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে।

এছাড়া জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে পানির নমুনা পরীক্ষার করে ২০ শতাংশের বেশি পারদের উপস্থিতি পাওয়া যায়। স্থানীয় এক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, গর্ভপাত ও ভ্রূণের জন্মগত ত্রুটি বাড়ছে। যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা একসময় বিরল ছিল, এখন সেগুলো প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে।

আবু হামাদের একটি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রেও রোগীর চাপ বেড়েছে। কেন্দ্রটি প্রায় ১০০ রোগীকে সেবা দিচ্ছে, যদিও এর সক্ষমতা এর চেয়ে অনেক কম ছিল।

বর্ষাকাল এলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুই বছর আগে বন্যার সময় খনি বর্জ্য ও টেইলিংস আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। প্রকৌশলী ও পরিবেশকর্মী হাশেম আবদেল আজিম আল-মাহি বলেন, ২০১৭ সালে সুদানে থাইওইউরিয়াকে ‘পরিবেশবান্ধব’ বিকল্প হিসেবে চালু করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন।

আবদেলআজিম বলেন, স্বর্ণ উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে ক্ষতিকর পদ্ধতি বন্ধ করে খাতটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্বর্ণ অনুসন্ধানের এ বিস্তার সামাজিক কাঠামোও বদলে দিচ্ছে। দারিদ্র্যের কারণে অনেক তরুণ পড়াশোনা ছেড়ে খনিতে কাজ করছে। ঘারিয়ার নর্দার্ন বয়েজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আহমেদ আবদেল আজিজ জানান, প্রাথমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৫ থেকে কমে ২০ জনে নেমে এসেছে। মাধ্যমিক পর্যায়েও একই ধরনের পতন ঘটেছে।

শিক্ষার্থীরা খনিতে কাজ করে দ্রুত গাড়ি কিনতে ও অর্থ উপার্জন করতে দেখা তরুণদের উদাহরণ হিসেবে সামনে রাখছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও অধ্যাপকের সংকট তৈরি হতে পারে।

সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘাত চলছে। সুদান ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড পলিসি ট্র্যাকার-এর সুলেইমান বালদোর মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দুই পক্ষই স্বর্ণের খনি নিয়ন্ত্রণে জড়িত।

আরও