একটি তোয়ালে থেকে কালজয়ী গান, নজরুল ও আব্বাসউদ্দীনের গল্প

আব্বাসউদ্দীনের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী আজ

একদিন আব্বাসউদ্দীন নতুন একটি ইসলামী গান চাইলেন। নজরুল তখন নাটক লেখায় ব্যস্ত। তিনি জানালেন, সেদিন গান লেখা সম্ভব নয়। আব্বাসউদ্দীন বললেন, তিনি জোহরের নামাজ পড়বেন— একটি জায়নামাজ দরকার। তাৎক্ষণিক ঘরে জায়নামাজ না পেয়ে নজরুল তাকে একটি পরিষ্কার তোয়ালে দিলেন

উপেক্ষিত জনপদের সুরকে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন ঘরে ঘরে। অথচ সেই মানুষটির পর্যাপ্ত ছবি, গান কিংবা অন্যান্য কর্মকাণ্ডের কথা আর্কাইভ করা নেই। তার গান আজও বেঁচে আছে মানুষের স্মৃতিতে। অথচ শিল্পীর নিজের স্মৃতি সংরক্ষণে আমরা কতটা যত্নবান সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’— এই গানের সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনারও ছোটবেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে? অতিজনপ্রিয় এ গানসহ কাজী নজরুল ইসলামের আরো অনেক ইসলামী গান তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন আমাদের কানে। তিনি হলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ।

বাংলায় ইসলামী গান রেকর্ড করার প্রশ্নে কলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানির দরজায় তখন প্রায় বন্ধ। তাদের আপত্তি ছিল সোজাসুজি— এ গান কে কিনবে? কিন্তু আব্বাসউদ্দীন আহমদ হাল ছাড়লেন না। তার বিশ্বাস ছিল, নিজের ভাষায় গাওয়া ধর্মীয় গান একদিন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাবেই। সেই বিশ্বাস নিয়ে তিনি গেলেন কাজী নজরুল ইসলামের কাছে। আর সেখান থেকেই জন্ম নিল এমন এক গান, যা বাঙালি মুসলমানের ঈদ-স্মৃতির সঙ্গে চিরকালের মতো জড়িয়ে গেল।

১৯৩২ সালে রেকর্ড হওয়া ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ছিল প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে এক শিল্পীর জেদি স্বপ্নের জয়। গানটি রেকর্ড হওয়ার পর ঈদ পালন করতে বাড়ি যান আব্বাসউদ্দীন। আর কলকাতায় ফেরার পথে ট্রামে অপরিচিত একজনকে গানটি গুনগুন করতে শুনলেন। পরে একদিন মাঠে এক তরুণদের দলকেও সেই সুরে মেতে থাকতে দেখলেন। বিস্মিত শিল্পী বুঝলেন, তার কণ্ঠে গাওয়া গান এরই মধ্যেই মানুষের আপন হয়ে উঠেছে।

আব্বাসউদ্দীন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং কাজী মোতাহার হোসেন

নজরুলের সঙ্গে তার সম্পর্কের আরেকটি ঘটনা যেন এই সৃষ্টির পেছনের আবেগটুকু আরো স্পষ্ট করে। একদিন আব্বাসউদ্দীন নতুন একটি ইসলামী গান চাইলেন। নজরুল তখন নাটক লেখায় ব্যস্ত। তিনি জানালেন, সেদিন গান লেখা সম্ভব নয়। আব্বাসউদ্দীন বললেন, তিনি জোহরের নামাজ পড়বেন— একটি জায়নামাজ দরকার। তাৎক্ষণিক ঘরে জায়নামাজ না পেয়ে নজরুল তাকে একটি পরিষ্কার তোয়ালে দিলেন। আব্বাসউদ্দীন নামাজে দাঁড়ালেন। নামাজ শেষে তোয়ালে ফেরত দিতে গিয়ে দেখলেন, হারমোনিয়ামের ওপর লেখা হয়ে আছে নতুন গান— ‘হে নামাজী, আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ’। আব্বাসউদ্দীনের আন্তরিকতা নজরুলকে স্পর্শ করেছিল। পরিবারিক স্মৃতিচারণে ঘটনাটি তাদের শিল্পীসত্তার পাশাপাশি বন্ধুত্বেরও এক অসাধারণ মুহূর্ত হয়ে উঠে।

কিন্তু আব্বাসউদ্দীনের গল্প কেবল নজরুলের সঙ্গে তার বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া, গাড়িয়ালের দীর্ঘশ্বাস আর বিচ্ছেদের গানকে গ্রামোফোনে তুলে তিনি এমন মানুষের জীবনকে বৃহত্তর বাংলার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যাদের কণ্ঠ সচরাচর শহুরে সংগীতের কেন্দ্রে পৌঁছাত না। ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর কোচবিহারের বলরামপুরে জন্ম এই শিল্পীর। ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি চলে যান। রেখে যান এমন গান, যা আজো ঈদের সকাল, নদীপারের বিরহ আর বাংলার মাটির সঙ্গে শ্রোতাদের জুড়ে দেয়।

আব্বাসউদ্দীনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হয়তো এখানেই, তিনি শুধু গান গেয়ে মানুষের মন জয় করেননি, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, যে সুরকে তথাকথিত ‘বাজার’ অস্বীকার করে, যে কণ্ঠকে সমাজ সহজে জায়গা দেয় না, সেই সুরও একদিন মানুষের আপন হয়ে উঠতে পারে।

আরও